আর জি কর আন্দোলনের আগুন যখন প্রায় নিবে গিয়েছে, তখন চাকরি বাতিল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা তৃণমূলের বিরুদ্ধে নতুন আন্দোলনের আগুন কি জ্বলবে? একটা নির্বাচিত সরকারের আমলে যে ভাবে একের পর এক দুর্নীতি প্রমান হচ্ছে, বিরোধীদের দাবি, অবিলম্বে এই সরকারের পদত্যাগ করাই শ্রেয়। প্রশ্ন উঠছে, এখন কোন পথে যাবে তৃণমূল কংগ্রেস?
‘শোক নয়, দ্রোহ’। আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরতা এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর এই স্লোগানেই “রাত দখল” হয়েছিল। রাজ্যের সাধারণ মানুষের এক স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছিল শাসককূল। দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন রাজ্যের দোর্দন্ডপ্রতাপ মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আন্দোলনের তেজ কমে এল, ধীরে ধীরে ফের মাথা উঁচিয়ে ঘুরতে লাগলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও তাঁর স্বস্তি বেশি দিন টিকলো না। এবার ২০১৬ এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ হওয়া পুরো ২৫ হাজার ৭৫৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীর চাকরি এক ধাক্কায় বাতিল করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। অভিযোগ লাগামহীন দুর্নীতি হয়েছে ওই নিয়োগে। যারা স্কুলে স্কুলে পড়ুয়াদের ভবিষ্যত তৈরি করবেন, তাঁরাই কিনা তাঁবেদারি বা ঘুষের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন! আর রাজ্যের সরকারি দলের যে বা যারা এই চাকরি চক্রের মাথা, তাঁরা এখনও মাথা উঁচু করে হম্বিতম্বি করছেন! এ লজ্জা কোথাই রাখি।
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু, যিনি দু বছর আগে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেই বেশ গর্বের সঙ্গে দাবি করেছিলেন, “চাকরিটা আমাদের পার্টির ছেলেরাই পাবে”। আসলে আসল কথাটা বলে ফেলেছিলেন ব্রাত্য বসু। তিনি যতটা না রাজনৈতিক জগতের মানুষ. তার থেকে বেশি পরিচিত নাটকের মঞ্চে। সেই ব্রাত্যই আজ চাকরি দুর্নীতি নিয়ে বেকায়দায়। কারণ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁকেই কার্যত দায় নিতে হচ্ছে এই ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীর। যদিও এই ২০১৬ সালের যে প্যানেল নিয়ে আজ এত বিতর্ক, সে সময় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন না ব্রাত্য বসু। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ব্রাত্যের সেদিনের কথাটাই মূল প্রতিপাদ্য। হয়তো তৃণমূলের ছেলে-মেয়েরাই চাকরিটা পেয়েছিল। কেউ বিপুল টাকা দিয়ে আবার কেউ কেউ আবার তৃণমূলের দাদা-দিদিদের চিরকূট দেখিয়ে।
কেন অযোগ্য ও যোগ্যদের আলাদা করা গেল না? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার সুযোগ দিয়েছিল রাজ্য সরকার এবং এসএসসিকে। কিন্তু কেউই সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি। আসলে যোগ্য এবং মেধাবীদের আড়ালে এই অযোগ্য এবং দলের কর্মীদের চাকরি পাওয়ার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। যা এখন তাঁদের কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এখন তীব্র আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সেটা কতটা ফলপ্রসু হবে, বিশেষ করে বামফ্রন্ট এবং বিজেপি নেতারা এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তাঁদের আন্দোলন কতটা গ্রামস্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবেন সেটা সন্দেহের আওতায় পরে। কিন্তু এই ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের ধাক্কা কিন্তু খাবে তৃণমূল। এটাই দেওয়াল লিখন। কারণ, এই মুহূর্তে তাঁদের হাতে সময় কম। আর জি করের আন্দোলন তাঁরা স্থিমিত করতে পেরেছিল কারণ, সামনে নির্বাচন ছিল না। এবার কিন্তু বছর ঘুরতেই বিধানসভা নির্বাচন। ফলে এই ২৬ হাজার চাকরিহারা এবং তাঁদের পরিবার তৃণমূলের বিপক্ষেই দাঁড়াবে। কারণ, কেউ টাকা দিয়েও চাকরি হারালেন, কেউ আবার প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েও হারালেন।
ক্ষোভ দু-তরফেই। তাই তৃণমূল সুপ্রিমো এখন চাইছেন চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আলোচনার টেবিলে ডেকেছেন নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। এখন দেখার সেই বৈঠকে কতজন হাজির হন। কিন্তু রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলে যদি কিছু থাকে, এত বৃহত্তর এক দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পর কোনও সরকার পক্ষের নৈতিক অধিকারই থাকে না ক্ষমতায় থাকার। কিন্তু এটা তৃণমূল কংগ্রেস, আর সেই দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ২০২৬ বিধানসভা ভোটের আগে ফের একবার কোনও চমক বা দান-ধ্যানের তাস খেলে দেবেন। আর চাকরিহারার যন্ত্রণা ভুলে অনেকেই ভোটের বাক্সে তৃণমূলকে উপরহস্ত করবেন। আবার এটাও হতে পারে, চাকরিহারাদের এই চোখের জল আগুন হয়ে এই রক্তচোষাদের পুড়িয়ে ধ্বংস করবে। কারণ, ইতিমধ্যেই বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিহারাদের একটা ঐক্য মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এবং তাঁরা আগামী ২১ এপ্রিল নবান্ন অভিযান করবে বলেই ঠিক করেছে।
Discussion about this post