গত বছর ৫ই অগাস্ট তথাকথিত ছাত্র নেতৃত্বের বিক্ষোভের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ফলে অন্তরবর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর সাত মাস কেটে গিয়েছে।
আর এই সময়কালে বিভিন্ন সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুস কে শেখ হাসিনার পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধেও বিরূপ মন্তব্য ও সুর চরাতে দেখা গিয়েছে। তবে বর্তমানে উল্টো-সুর শোনা যাচ্ছে ইউনুসের কন্ঠে। কিন্তু কেন? কি এমন হলো যে ভারতকে এখন সুসম্পর্কের বার্তা দিচ্ছেন ইউনুস?
বন্ধু রাষ্ট্র ভারতকে একপ্রকার শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোঃ ইউনুস বলেন,” মাঝপথে কিছু দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। বলা যায় কিছু মেঘ জমে ছিল দু দেশের সম্পর্কে। আর সমস্ত মেঘটাই প্রচারের মাধ্যমেই এসেছিল। কারণ অন্যেরা এর উৎস কে প্রচার হিসেবেই বিবেচিত করবে। ”
বাংলাদেশের পট পরিবর্তনের সাত মাস পর এখন ভারত প্রসঙ্গে সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতির কথা শোনা যাচ্ছে ইউনূসের মুখে ।
ড: ইউনুসের এই সমস্ত মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে যখন ইউএনবি কুটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, ৪ এপ্রিল ২০২৫ এ ব্যাংককে বিমস্টেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি সরকার প্রধান উপদেষ্টা মোঃ ইউনুস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির মধ্যে প্রথমবারের জন্য বৈঠক হতে পারে।
মহম্মদ ইউনুস দুই দেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থাতেই রয়েছে, এবং কোন অবনতিও হয়নি সেই সম্পর্কের। তিনি আরও বলেন, কিছু ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল, সেই ভুল বোঝাবুঝি গুলোকে কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট আমরা। দুই দেশের মৌলিক সম্পর্কের মধ্যে কোন সমস্যা নেই।
তার মাঝে আরও এক ইতিবাচক সংকেত ইউনূসের তরফ থেকে ভারতকে। যে মুহূর্তে বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষ চরমে উঠেছে, সে মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় এলেন ইন্দো-বাংলাদেশ জয়েন্ট রিভার কমিশনের ১১ জনের প্রতিনিধি দল। বলা বাহুল্য তাঁরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলের সদস্য।
সোমবারই এই প্রতিনিধি দল কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন এবং তাঁদের সাদরে বরণ করা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলে মূলত নদী বিশেষজ্ঞরাই রয়েছেন। যারা আগামী ৫ দিন কলকাতা ও ফারাক্কার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করবেন এবং নবান্নে পশ্চিমবঙ্গের সেচ দফতরের সচিবের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও করবেন। আগামী ৮ মার্চ তাঁদের ঢাকা ফিরে যাওয়ার কথা। আপনাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে, মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের অনেকেই যখন প্রতিনিয়ত নিয়ম করে ভারতবিরোধী মন্তব্য করে চলেছেন। কেউ কেউ সরাসরি হুমকি, হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন, সেই মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার কেন আচমকা ভারতে প্রতিনিধি দল পাঠাতে গেলেন? আসলে গঙ্গা-তিস্তা সহ কয়েকটি নদীর জল বন্টন নিয়ে যে চুক্তি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে তা শেষ হতে চলেছে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। তার আগে চুক্তির নবীকরণ নিয়ে কথা বলতেই বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলের আসা।
সূত্রের খবর, এর আগেই হাসিনা গঙ্গা জলবন্টন চুক্তি নবীকরণ নিয়ে কিছু কথাবার্তা এগিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরই গণঅভ্যুত্থান হয় বাংলাদেশে এবং হাসিনা গদিচ্যুত হন। তাই এবার ভারতের সঙ্গে গঙ্গা ও তিস্তা নদী সহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করা নদীর জল নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারকে। কিন্তু এই আলচনা হবে একটা তিক্ত সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে। কারণ গত বছর অগস্ট মাসে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অনেকটাই অবনতি হয়েছে। ৫ অগস্ট বাংলাদেশে গণআন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন শেখ হাসিনা। পালিয়ে আসেন ভারতে। তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। এখনও তার উত্তর দেয়নি নয়াদিল্লি। ফলে গঙ্গা ও তিস্তার মতো নদীর জল বন্টন নিয়ে ভারত এবার বাংলাদেশের দাবিকে মান্যতা দেবে এমন নির্ভরযোগ্যতা কম।












Discussion about this post