রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা বকেয়া মহার্ঘ ভাতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই লড়ছেন। মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টের অধীনে। তবে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে ২৫ শতাংশ ডিএ মিটিয়ে দিতে। রাজ্যের আইনজীবীর দাবি, এতেই রাজ্য সরকারের কোমর ভেঙে যাবে।
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বহু প্রতীক্ষিত ডিএ মামলার শুনানি অবশেষে শুরু হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে রাজ্যের ডিএ মামলা প্রথম সুপ্রিম কোর্টে উঠেছিল। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে এই মামলাটি বারেবারে পিছিয়ে যাচ্ছিল সুপ্রিম কোর্টে। এবার বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার ডিভিশন বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়েছে। আর তাতেই বড় ধাক্কা খেল রাজ্য সরকার। সেই ধাক্কার অভিঘাত এতটাই বেশি যে, নির্দেশমতো বকেয়া ডিএ মেটাতে হলে রাজ্যের নাকি কোমরই ভেঙে যাবে। আর এই দাবি করেছেন স্বয়ং রাজ্য সরকারের আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভী। ডিএ মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যকে বলে, ৫০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে দিন। মামলা চলুক। যা শুনে রাজ্যের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙভি রীতিমতো কেঁপে ওঠেন। সুপ্রিম কোর্টের লাইভ স্ট্রিমিং থেকেই বোঝা যায়, বিচারপতি মৌখিকভাবে যখন ৫০ শতাংশ বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলে কোর্ট অফিসারকে ডেকে নেন সেই নির্দেশ লিখিত আকারে নথিভুক্ত করার জন্য, ঠিক সেই সময়ই অভিষেক মনু সিংভী রীতিমতো আর্তনাদ করে ওঠেন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিনি সওয়াল করছিলেন, বিচারপতির মন্তব্য শুনেই তিনি বলতে থাকেন, “এটা বিপুল পরিমাণ টাকা। এই টাকা দিতে হলে রাজ্য সরকারের কোমর ভেঙে যাবে”।
রাজ্যের প্রধান আইনজীবীর আর্তনাদ শুনে দুটো প্রশ্ন জাগে মনে। প্রথমটা হল ইংরেজিতে সওয়াল করতে গিয়ে তিনি যে শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন তার সঠিক বাংলা তর্জমা কি? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই রাজ্য সরকার যে এত খেলা, মেলা, দানধ্যান করে থাকে, তাঁদের কাছে বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিতে এত সমস্যা কোথায়?
অভিষেক মনু সিংভি, যিনি কংগ্রেস নেতা এবং দেশের একজন প্রথমসারির দাপুটে আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। ফলে সর্বোচ্চ আদালতে সওয়াল জবাবের সময় তিনি নেহাত নাটুকে আবেদন করবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, রাজ্য সরকারের আসল সমস্যাটা তিনি জানেন, এবং সেই কারণেই ডিএ দেওয়া নিয়ে বিরোধিতা করছেন সরকারি কর্মচারিদের মামলায়। যখনই বিচারপতি ৫০ শতাংশ ডিএ দিয়ে দেওয়ার কথা বললেন এবং তা নির্দেশে লেখার তোড়জোড় শুরু করলেন, তখনই অভিষেক মনু সিংভি ইংরেজিতে বললেন, “মাই লর্ড, ইট উইল বি এ হিউজ ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকব্রেকিং লায়লাবিলিটি”। অনেকেই রসিকতা করছেন এই “ব্যাকব্রেকিং” শব্দবন্ধটি নিয়ে। গোদা বাংলায় এটির একটি অর্থ হয় “পিছন ফাঁটা”, আর ভালোভাষায় অর্থ করা যেতে পারে কোমর ভাঙা। এখন রাজ্যের আইনজীবী কোন অর্থে এই ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়েই যত তর্ক। ওয়াকিবহাল মহলের একটা অংশ অবশ্য বলছেন, এই ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মেটাতেই রাজ্য সরকারের পিছন ফেটে যাবে। নির্দেশ অনুযায়ী যে অর্থের সংস্থান রাজ্য সরকারকে করতে হবে, তার পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার একটু বেশি। আগামী বছর বিধানসভা ভোট, তার আগে ডিএ মামলায় কার্যত পর্যদুস্ত হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া যেভাবেই হোক মেটাতে হবে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল বলে মনে করছেন শাসক শিবির এবং রাজ্য প্রশাসনের একাংশ। তৃণমূলের একাংশ দাবি করছে, আগামী ভোটের আগে রাজ্য সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো কয়েকটি প্রকল্পে অনুদান বৃদ্ধি করার চিন্তাভাবনা করছিল। এখন বকেয়া ডিএ বাবদ ১০-১২ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে।
সংস্কৃতি একটি কথা আছে, “ঋণম কৃত্যা, ঘৃতম পিবেত”। অর্থাৎ ধার করে হলেও ঘি খেতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকৃত দশা এখন এটাই। ৩৫ বছরে বামেদের ছেড়ে যাওয়া ঋণ ছিল ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু তৃণমূলের শাসনকালের বিগত ১৪ বছরে বামেদের ১০ গোল দিয়ে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকায় ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। চলতি বাজেট পরিসংখ্যান বলছে, এই আর্থিক বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা খালি ঋণ শোধ করবে। চলতি আর্থিক বছরে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বরাদ্দ ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বাংলার বাড়ি প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেট পরিসংখ্যান বলছে, চলতি আর্থিক বছরে রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এই কারণেই অভিষেক মনু সিংভি সুপ্রিম কোর্টে আর্তনাদ করছিলেন, হুজুর মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। ৫০ শতাংশ মেটাতে হলে খরচ হবে ২০ হাজার কোটি। সত্যিই তো, এই বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে রাজ্য সরকার যদি বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করতে হতো, তাহলে পিছন ফেঁটে যাওয়ারই সামিল। তবে রাজ্যের আইনজীবীর সাওয়াল শুনে বিচারপতিরা আপাতত ২৫ শতাংশ বকেয়া মেটানোর নির্দেশই দিয়েছেন। এটাই যা স্বস্তির।












Discussion about this post