বাংলাদেশে নির্বাচনের ঢাকি কাঠি পড়ে গিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি মেনে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যদি জাতীয় নির্বাচন হয়, তাহলে হাতে আর মাত্র পাঁচ মাস। যদিও গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মুহা্মদ ইউনূসের রাজত্বকালে বিগত এক বছরে বাংলাদেশজুড়ে অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা ছাড়া গঠনমূলক কিছু চোখে পড়েনি। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলে ক্ষমতায় আসা ইউনূস সাহেব দেখতে দেখতে এক বছর পার করে দিলেন। তবে আশার আলো বলতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভোট শুরু হয়েছে। যেমন ঢাকা ও জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটগ্রহন হয়ে গিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলাফলও ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্যাম্পাস নির্বাচনগুলি জাতীয় নির্বাচনের ড্রেস রিহার্সাল বা সেমি ফাইনাল ধরা যেতেই পারে। কারণ, এখানে যারা ভোট দেবেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাঁরাই অংশগ্রহন করবেন। ফলে এই নির্বাচনগুলির ফলাফল বিশ্লেষণ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনের একটা স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যাবে।
ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে প্রবল উৎকণ্ঠায় ভুগছে বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি বা বিএনপি। কারণ তাঁদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটে। আর চরম উৎফুল্ল জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ, কারণ তাঁদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এই প্রথমবার ল্যান্ডস্লাইড জয় পেয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই বিএনপি নেতার এক মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের জয়ের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অভিযোগ করে বলেছেন, তলে তলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ছাত্রলীগের সব ভোট নিয়ে নিয়েছে জামাতের ছাত্রশিবির।
ডাকসুর পর জাকসুর নির্বাচন ঘিরেও জামাতের বিরুদ্ধে নানান কারচুপি ও দাদাগিরির অভিযোগ তুলে বিএনপি সমর্থিত ছাত্রজোট নির্বাচন বয়কট করেছে। ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ভরাডুবির আশঙ্কা করছে বিএনপি। মির্জা আব্বাসের মতো নেতৃত্ব যেমন বলেই দিলেন, ছাত্রভোটে আমাদের পরাজয় হয়েছে এটা মেনেই নিলাম। তবে তার পরেও তিনি যোগ করলেন আওয়ামী লীগ ও জামায়তে ইসলামীর আঁতাতে দাবি। এটাই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। কারণ, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনও অস্তিত্বই নেই বললে চলে। যদিও তাঁদের তরফে মিছিল হচ্ছে, কিন্তু অংশগ্রহনমূলক কোনও কাজে তাঁদের সমর্থকরা থাকতে পারছেন না। যেমন, ডাকসু বা জাকসুর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ পুরোপুরি ব্রাত্য। তাঁদের চিহ্নিত সমর্থকদের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের আশেপাশেও ঘেঁষতে দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা যে ভোট দিতে যাবেন, এটাই কষ্টকল্পনা। তাহলে কেন এই দাবি করলেন প্রবীন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস?
সূত্রের খবর, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাতের এই উত্থান সিঁদূরে মেঘ হিসেবেই দেখছেন বিএনপি নেতারা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জিয়া ডাকসুর নির্বাচনী ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি একান্তে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এই ফলাফল ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। এমনকি তাঁর চিন্তা, ভবিষ্যতে জামাতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নাও থাকতে পারে এবং দুরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। বিএনপির একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, গত জুলাই মাসেই ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দি অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এবং সেই বৈঠকে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া হয়েছিল যে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর যাতে বিএনপি ক্ষমতায় আসে, এর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করবে। কিন্তু ডাকসুর নির্বাচনী ফল অন্য ইঙ্গিত করছে। জানা যাচ্ছে, ডাকসুর ফল থেকে আতঙ্কিত তারেক সরাসরি ফোন করেন ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনকে। ফোনে তারেক জামাতের সঙ্গে আগামী জোট নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। সূত্রের খবর, তারেকের ফোনালাপের পরই মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত পৌঁছে গিয়েছিলেন জামাতের আমীর সফিকুর রহমানের কাছে। জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর দুটো নাগাদ ট্রেসি জ্যাকবসন জামাতের আমীরের বাড়িতে গিয়ে ঘণ্টাখানেক বৈঠক করেন। বলা হচ্ছে মার্কিন দূত সফিকুর রহমানের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল দাবি করছে এই সাক্ষাৎ ছিল অন্য কারণে। সেটা হল, আগামী নির্বাচনে যাতে জামাত শিবির বিএনপির সাথে মিলেমিশে সরকার গঠনের দিকে এগোয় সেটা নিয়ে তদ্বির করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। সবমিলিয়ে ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল অনেক হিসেব নিকেস পাল্টে দিল বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। যেখানে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে বলেই দাবি করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।












Discussion about this post