গত ১৭ নভেম্বর হাসিনার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং সাজা ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের জন্য বেশ জোরালো ভাষায় ভারতের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। এটা অবশ্য নতুন নয়, এর আগেও দুবার এই একই চিঠি পাঠিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যাকে কূটনৈতিক ভাষায় “নোট ভার্বল” বলা হয়। তবে আগের দুটো চিঠির থেকে এবারে পাঠানো চিঠির পার্থক্য আছে। সেটা হল এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন। ফলে ঢাকার দাবি আরও জোরালো এবার। এর ফলে ঢাকা যে চিঠি নয়া দিল্লিকে দিয়েছে তাঁর ভাষাও যথেষ্ট কঠোর। ফলে অনেকেই অসীম আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন দিল্লি কি জবাব দেয়। দেখা গেল এবারও আগের মতো বাংলাদেশ থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণের চিঠিকে কার্যত পাত্তা দিল না নয়া দিল্লি। যা ঢাকার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বুধবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, আমরা এই সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছি, আমরা এর আইনগত দিক খতিয়ে দেখছি। তবেহাসিনাকে ফেরানো নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করলেও কূটনৈতিক ভাষায় অন্য একটি বার্তাও দিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র কার্যত ঘুরিয়ে বলে দিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে কোনও কথা বলতে নারাজ মোদি সরকার। এই সরকার অনির্বাচিত, পরে বাংলাদেশের কোনও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই তাঁরা আলোচনা করবে। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, ভারত আপাতত হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে হাসিনার প্রত্যর্পণ “ভারতের জন্য একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব” ছিল, মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে আরও বলেছে, “যদি কোনও দেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এই ব্যক্তিদের আশ্রয় দেয়, তবে তা হবে অত্যন্ত অ-বন্ধুত্বপূর্ণ কাজ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবমাননা। হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ঢাকার চিঠির বিষয়টি ভারত স্বীকার করলেও এক বিবৃতিতে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় কেবল বলেছে যে তারা “রায়টি লক্ষ্য করেছে”। পাশাপাশি এও বলেছে, একটি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে, ভারত বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যার মধ্যে রয়েছে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি এবং স্থিতিশীলতা। আমরা সর্বদা সেই লক্ষ্যে সকল অংশীদারদের সাথে গঠনমূলকভাবে যোগাযোগ করবো। অর্থাৎ, ভারত স্পষ্ট করে দিল, সকল অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ করবে। এখানে অংশীদার বলতে রাজনৈতিক বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। বলা যায়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধটি ভারত উপেক্ষাই করছে।
ভারতের আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি এত সহজে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু শেখ হাসিনাকে মুহাম্মদ ইউনূসের মতো অনির্বাচিত কোনও শাসকের হাতে তুলে দেবে না। মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রয়েছে, যার একটি সীমিত এজেন্ডা এবং ম্যান্ডেট রয়েছে। ভারত দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি গ্রহণের জন্য একটি নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। ভারত ও বাংলাদেশ ২০১৩ সালে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই চুক্তির অধীনে হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য চাপ দেবে। কিন্তু সেই চুক্তিতে এমন কয়েকটি ধারা আছে যা দেখিয়ে ভারত হাসিনার প্রত্যর্পণ অস্বীকার করতেই পারে। আরও একটি মত সামনে আসছে, এমনিতেই শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের প্রতি ভারতে খুব কম সমর্থন রয়েছে। কিন্তু ট্রাইবুনালের মাধ্যমে তড়িঘড়ি হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর প্রত্যর্পণের বিরোধিতা আরও বাড়বে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁর প্রত্যর্পণের বিরোধিতা করছে।
কেউ কেউ বলছেন, ভারত জানিয়েছে ভারতীয় আইনের আওতায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় খতিয়ে দেখা হবে। এর অর্থ হল, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের যে বিচার করা হয়েছে বাংলাদেশের ট্রাইবুনালে, তা সঠিক ভাবে হয়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার বিচার যদি সে দেশের হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে হতো, তাহলে ভারতের পক্ষে চাপের হতো। কিন্তু বিচার করা হয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে। এই ট্রাইবুনাল তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য। সেখানে হাসিনার বিচার করানোর সিদ্ধান্ত ছিল ইউনূস সরকারের নির্বুদ্ধিতা। এই কারণেই আন্তর্জাতিক মহলেও এই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। ভারতও এই অজুহাত দেখিয়ে হাসিনার প্রত্যর্পণ আটকে দেবে।












Discussion about this post