আর জি কর নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি কেন হাতের বাইরে চলে গেল? এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেরাচ্ছে শাসকদল। এর মধ্যেই তৃণমূলের শীর্ষস্তর যে কার্যত দুই ভাগ, সেটাও এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। জনমানসের মধ্যে এই ক্ষোভ কিভাবে প্রশমিত হবে সেটাও স্পষ্ট নয়, এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীরা কি করবেন, তার কোনও রূপরেখা দিতে পারছেন না তৃণমূলের শীর্ষনেতারা। ফলে রাশ পুরোপুরি হাতের বাইরে বলেই মনে করছেন বাংলার রাজনৈতিক মহল। তবে তৃণমূল নেতারা এই পরিস্থিতির জন্য চারটি ঘটনাকে দায়ী করছেন। যদিও সামনাসামনি কেউ মুখ খুলছেন না, তবে ভিতর ভিতর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
আর জি কর হাসপাতালের ভিতরেই এক কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসকের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত। সেই ৯ আগষ্টের ঘটনা, এরপর কেটে গিয়েছে ১০-১১ দিন। তবুও ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে না জনগণের। কিন্তু প্রথমদিকে এই পরিস্থিতি ছিল না। কিন্তু আর জি কর হাসপাতালের অধ্যাক্ষ সন্দীপ ঘোষ চাপে পড়ে পদত্যাগ করার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাঁকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যাক্ষ পদে বহাল করাটা ভুল হয়েছে। এমনটাই দাবি করছেন তৃণমূল নেতাদের একটা বড় অংশ। সন্দীপ ঘোষকে নিয়ে যে ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল, এই ঘটনায় তা তীব্র আঁকার নিয়ে নেয়। জুনিয়র ও আবাসিক ডাক্তারদের আন্দোলন আর জি কর থেকে অন্যান্য মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ছড়িয়ে পড়ল। ১২ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে মৃতা চিকিৎসকের সোদপুরের বাড়িতে যান। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি যথেষ্টই সংবেদনশীল বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার কয়েকঘন্টার মধ্যেই সন্দীপ ঘোষের পুনর্বহাল বুমেরাং হয়ে যায়। তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ, প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, সন্দীপ ঘোষ দোষী না নির্দোষ সেটা তদন্তসাপেক্ষ, তবে তাঁর নিয়োগ নিয়ে বড্ড তাড়াহুড়ো হয়ে গিয়েছে। যা জনমানসে একটা ভুল বার্তা গিয়েছে। কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যে বললেও, বাকি অনেক নেতা এটা প্রকারন্তরে মেনে নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, সন্দীপ ঘোষকে নিয়ে রাজ্য সরকার কলকাতা হাইকোর্টেও সমালোচিত হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর দ্বিতীয় যে ভুলটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে সেটা হল, সেমিনার হলের পাশেই একটি ঘর ভেঙে দেওয়া। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সংস্কারের জন্যই ওই জায়গা ভাঙেছে রাজ্যের পূর্ত দফতর। কিন্তু তৃণমূল নেতাদের একাংশ বলছেন, এই কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি। কারণ এতে জনমানসে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, প্রমান লোপাটের জন্যই এই কাজ করা হয়েছে। গত ১০ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী মৃতা চিকিৎসকের বাড়িতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, পুলিশ রবিবারের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পারলে তিনি নিজে তদন্তভার সিবিআইকে দেবেন। তখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে ছিল। মানুষের মধ্যে তখনও এতটা ক্ষোভ তৈরি হয়নি। কিন্তু পরপর দুটি ভুল সিদ্ধান্ত গোটা বিষয়টাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৩ আগস্ট সেমিনার হলের একদিকের দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার পর আর জি করে আন্দোলন আরও তীব্র আকার নিতে শুরু করে। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, এই দুটি ঘটনার পরই প্রমান লোপাটের তত্ত্ব আরও জোরালো হয় এবং মহিলাদের রাত দখল কর্মসূচি গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে দাবালনের মতো।
মহিলাদের রাত দখল কর্মসূচি ছিল স্বাধীনতার রাতে, অর্থাৎ ১৪ আগস্ট রাতে। স্বাধীনতা দিবসের মতো আবেকঘন সময় আর জি কর হাসপাতালে নির্বিচারে হামলা হল। আর পরদিন থেকে মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনার জন্য দায়ি করে বসলেন বাম ও বিজেপিকে। মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলেন, সেই সঙ্গে বললেন আর জি করে হামলা চালিয়েছে বাম ও রাম একসঙ্গে। তদন্ত না করে, সাত-পাঁচ না ভেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দাবিই বুমেরাং হয়ে যায়। কারণ, আর জি কর হাসপাতালের সামনে যেখানে বামফ্রন্টের যুব ও ছাত্র সংসগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েছিল। একই পথে অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছিল বিজেপিও। কিন্তু তাঁরা হাসপাতালে ভাঙচুর করবে, এই তত্ত্ব অনেকেই বিশ্বাস করেনি। এর ওপর কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়. যেখানে বলতে শোনা গিয়েছিল সেমিনার হল ভাঙার ব্যাপারে। যদিও সেই সমস্ত ভাইরাল ভিডিও-র সত্যতা যাচাই করেনি নিউজ বর্তমান। কিন্তু এই ঘটনাও সাধারণ মানুষকে শাসকদলের থেকে দুরে ঠেলে দিয়েছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।
চতুর্খত যে কারণটা সামনে আসছে সেটা হল ডার্বি বাতিলের সিদ্ধান্ত। আর জি কর হাসপাতালের নারকীয় কাণ্ড নিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বিচার চাইছেন। তিনিও সিবিআই তদন্ত হলে আপত্তি নেই বলছেন। কিন্তু অন্য কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলেই পুলিশ তাঁদের আটকানোর চেষ্টা করছে। যেটা শাসকদলের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে। গত রবিবার ছিল ঐতিহ্যের ডার্বি। ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগান সমর্থকদের একাংশ ঠিক করেছিলেন তাঁরা গ্যালারিতেই নিজেদের মতো করে আর জি কর নিয়ে প্রতিবাদ জানাবেন। এই খবর প্রচার হতেই আসরে নামে বিধাননগর পুলিশ। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয় ডার্বি ম্যাচ। এরপরও দুই দলের সমর্থকরা জড়ো হয় যুবভারতীর সামনে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল রবিবার প্রচুর পুলিশকর্মী মোতায়েন রয়েছে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঠেকাতে। এমনকি দুই দলের সমর্থকদের ওপর লাঠিচার্জও করে পুলিশ। তৃণমূলের প্রথমসারির কয়েকজন নেতা ডার্বি বাতিল যাতে না হয় সেই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনও পক্ষের কোনও কথা না শুনেই পুলিশ ফুটবলপ্রেমীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলল। ফলে ১৪ আগস্টের রাত দখলের পর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এবং কলকাতায় মাঝেমধ্যেই মানুষ স্বতপ্রণোদিতভাবে জড়ো হয়ে যাচ্ছেন প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে কোনও আগাম কর্মসূচি ছাড়াই। চিকিৎসকম মহল, আইনজীবী মহল, টলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা, গায়ক-গায়িকা, নাট্যকর্মীরা নিয়ম করে পথে নামছেন। ফলে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ থামার লক্ষণ নেই। যা নিয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন তৃণমূলের একাংশ। যদিও আরেক অংশের বক্তব্য, সব প্রতিবাদই হচ্ছে শহরকেন্দ্রীক, গ্রামাঞ্চলে এর আঁচ পড়েনি। কিন্তু আর জি কর নিয়ে শাসকদল যে যথেষ্টই চাপে সেটা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করছেন। যদিও প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না।












Discussion about this post