ভারতের গান্ধি পরিবার, পাকিস্তানে ভুট্টো, শ্রীলঙ্কায় বন্দরনায়েক পরিবারের মতো বাংলাদেশেও এবার জিয়া পরিবারের তিন সদস্য দেশ শাসনের ভার হাতে তুলে নিলেন। মঙ্গলবার, তারের রহমান জিয়া বাংলাদেশের নবতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এই নজির গড়লেন তিনি। বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রপতি তথা সেনানায়ক। খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। এবার তাঁদের পুত্র তারেক রহমান জিয়া হলেন প্রধানমন্ত্রী। মজার বিষয়, এখনও বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেত্রী শেখ হাসিনা তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা বা অভিনন্দন পর্যন্ত দেননি। যেখানে তিনি প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা বিষয়ে নিজের মনোভাব জানিয়ে আসছিলেন, তিনিই কিনা আশ্চর্য রকমের চুপ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমানকে দলের তরফে শেখ হাসিনার অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে আওয়ামী লীগের অন্দরে আলোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে দলটির মধ্যে দোলাচলও বর্তমান। জানা গিয়েছে, এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। সুত্রের খবর, দলের নবীন নেতৃত্ব চাইছে ত্রয়োদন জাতীয় নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন বলার পর সেই নির্বাচনে বিজয়ী ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁকে অভিনন্দন জানানোর অর্থ ভোটকে মান্যতা দেওয়া। তাই তাঁকে শুভেচ্ছা জানানো উচিৎ হবে না। আবার দলের সিনিয়র নেতাদের একটা বড় অংশের দাবি, দল, নির্বাচন ও সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে অভিনন্দন জানানোটাই সৌজন্যের পরিচয়। তাঁদের যুক্তি, তারেক রহমান এখন বিএনপির চেয়ারম্যান। অর্থাৎ দলীয় পদমর্যাদায় তিনি শেখ হাসিনার সমপর্যায়ে পড়েন।
এখন প্রশ্ন শেখ হাসিনা কি করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে। এই সম্ভবনা তৈরি হওয়ায় শেখ হাসিনা সাবধানী অবস্থান নিয়েছে। তিনি আসলে পুরো বিষয়টা আরও ভালো করে বুঝে নিতে চাইছেন। এরমধ্যে জড়িয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের ভূমিকাও। এখনও পর্যন্ত যা খবর, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিএনপি নতুন করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা দলীয় কার্যালয়ের ওপর হামলা বা আক্রমণ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের বেশকিছু জেলায় বিএনপি নেতারা উদ্যোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের বন্ধ অফিসের তালা খুলে দিয়েছেন বলেই খবর। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ‘জয় শেখ হাসিনা’ বলে স্লোগান দিয়েছেন। যা মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নির্বাসিত আওয়ামী লীগের জন্য সুখের খবর বটে। ফলে নেত্রী শেখ হাসিনা একটু সময় নিচ্ছেন।
২০২৪ এর ৫ অগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে এলেও আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার দাবি করে আসছিল, শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা নিজেও বারে বারে দাবি করছিলেন তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেননি। পরবর্তী সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও একই দাবি করেন, যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র হাতে পাননি। শেখ হাসিনা একবার দাবি করেছিলেন, হেলিকপ্টারে তেজগাঁও বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি জানতেন তাকে তাঁর সংসদীয় কেন্দ্র তথা জন্মভিটা গোপালগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক পরে তিনি জানতে পারেন তাঁকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই আচমকা শেখ হাসিনা নিজেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দাবি করা বন্ধ করেছেন। দেখা যাচ্ছে, গত ১৭ জানুয়ারি থেকে আওয়ামী লীগ তাঁদের লেখা বিভিন্ন পত্রে বা পোস্টে শেখ হাসিনাকে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করা বন্ধ করে দিয়েছে। অপরদিকে শেখ হাসিনা পালা করে দলের ফেসবুক পেজে দায়মুক্তি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নির্যাতিত নিপীড়িত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। বর্তমনে আওয়ামী লীগ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও জননেত্রী বলেই উল্লেখ করছে। যেখানে কয়েকদিন আগেও তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছিল। এবার তাঁকে আর প্রধানমন্ত্রী বলা হচ্ছে না। তাহলে কি, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার পথেই আওয়ামী লীগ? বাংলাদেশের ওয়াকিবহাল মহলের মতে, কয়েকদিনের মধ্যেই এর জবাব পাওয়া যাবে।












Discussion about this post