কয়েকটি বিক্ষিপ্ত অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটের ফলও প্রকাশিত হয়েছে, এমনকি সে দেশে নতুন সরকারও গঠিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর জটিলতা। তা হল, নবনির্বাচিত বিএনপি সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্তার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে চাননি। আর এই কারণেই সৃষ্টি হয়ে জটিলতা। এবার জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশে সংবিধান সংস্কারের জন্য জুলাই সনদের প্রস্তাব মেনে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে আবার ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, সংস্কারের পক্ষে জনগণ মত দিয়েছে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে বিএনপির নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যখন গণপরিষদে শপথ নেওয়ার ব্যাপারে সাহসী পদক্ষেপ নিল বিএনপি। তখন কেন খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিল তাঁরা। কার কাছে মাথা নত করলেন তারেক রহমান?
বাংলাদেশ সংবিধানের ৭ এর ১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। আর এই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার স্বীকৃতিতে গণভোট আদেশ জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু ঐকমত্য কমিটিতে দলের প্রতিনিধিত্ব করা বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের ঠিক আগে জানান, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সংবিধানের পক্ষে। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ সংবিধানবহির্ভূত হওয়ায় বিএনপির সাংসদরা এই পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেবেন না। তাঁরা শুধু জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। এরপরই কার্যত ভেস্তে যায় বাংলাদেশের তথাকথিক সংবিধান সংস্কারের বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, সংবিধান চালু থাকলে সংস্কার পরিষদ গঠনের এই ‘রিচুয়াল’ কার্যত অসাংবিধানিক। তাঁদের মতে, অতীতে বহু বার এ ভাবে সংবিধান সংস্কার হয়েছে। তাঁদের মতে, এই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নির্বাচিত সংসদের অধিকার ও এক্তিয়ারকে খর্ব করছে। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদও একই দাবি করেছেন। আসলে বাংলাদেশের সংবিধান মেনে স্পিকার সাংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পড়াতে না পারলে, মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক তা পড়াতে পারবেন। সেই মতো বাংলাদেশের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক নাসির উদ্দিন মঙ্গলবার শপথবাক্য পাঠ করান। কিন্তু গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের কে শপথবাক্য পাঠ করাবেন তার কোনও উল্লেখ নেই। তাই নাসির উদ্দিন যদি শপথবাক্য পাঠ করাতেন তাহলে তা সাংবিধানিক সংকটের উত্থান হতো। বিএনপির এই দাবির প্রতিবাদ করে প্রথমে তীব্র বিরোধিতা করে জামায়াত এবং এনসিপি জানিয়েছিল, তাঁদের সাংসদরা কোনও শপথই নেবেন না। জামায়াত ও এনসিপি মত বদলে জানায়, তাদের সদস্যরা দুই শপথই নেবেন। সেই অনুযায়ী তাঁরা প্রথমে সাংসদ হিসেবে শপথ নেন। পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথটি নেন। উল্লেখ্য, স্বতন্ত্র তথা বিএনপির বহিস্কৃত সদস্যরাও একটি মাত্র শপথ নিয়েছেন। পরে অবশ্য জামায়াত ও এনসিপি ‘জুলাই শহিদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তোলে বিএনপির বিরুদ্ধে। জামায়াতের আমির তথা বিরোধী দলনেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারি দল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর শপথ না-নিয়ে জুলাইকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। এটা জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীত অবস্থান।
এনসিপির পক্ষেও সারজিস আলম বলেন, ‘জুলাই শহিদদের সঙ্গে গদ্দারি করেই একটি নতুন সরকার পথচলা শুরু করল। আমরা তাদের সঙ্গে থাকতে পারি না। যদিও বিএনপির এই সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের আইনজ্ঞ মহল এবং আওয়ামী লীগের তরফে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। আইনজীবীদের একাংশের দাবি, অসাধারণ সাহসের সঙ্গে বাংলাদেশ ও তার সংবিধানকে জামায়াতের হাত থেকে রক্ষা করল বিএনপি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে এ জন্য কুর্নিশ জানাতেই হয়। তাঁদের বক্তব্য, বাহাত্তরের সংবিধান ধ্বংসের যে পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র রচনা করেছিল জামাত ও তাঁদের সহযোগী দলগুলি, তারেক রহমান তাতে জল ঢেলে দিয়েছেন। এখন যদি বাংলাদেশের সংবিধানে কিছু সংশোধন করতেও হয়, তা বাহাত্তরের সংবিধান মেনেই করতে পারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি। এতে মুখ পুড়বে জামাতের। তবে যে প্রশ্নটা থেকেই গেল সেটা হল খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে দেওয়া। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির ধাক্কা সামলাতেই ইউনূসের আমলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেওয়া হল।












Discussion about this post