গত বছর গণঅভ্যুত্থআনের পর ঢাকা ত্যাগের পর প্রথমবারের মতো এত বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর সাক্ষাৎকারগুলি থেকেই উঠে আসছে সেই সময়ের কিছু অপ্রকাশিত ঘটনার টুকরো টুকরো তথ্য। সোমবারই ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তবুও অবিচল শেখ হাসিনা। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়কে প্রহসনের বিচার বলেও কটাক্ষ করলেন তিনি। তাঁর কথায়, এই রায়ে ‘কারসাজি করা হয়েছে’ এবং ‘আগেই ঠিক করে রাখা ছিল’। পাশাপাশি এই রায়কে একটি অগণতান্ত্রিক অনির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্ত বলেও আখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি তাঁর অভিযোগ, তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়নি। এদিন শেখ হাসিনার ফাঁসির সাজা ঘোষণার দিনেও একটি প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে ঘোরাফেরা করছে। সেটা হল, গত বছর গণঅভ্যুত্থান এবং হাসিনার প্রস্থানের পিছনে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের ভূমিকা। এতদিন পর এই প্রসঙ্গ ওঠার কারণ হল, সম্প্রতি সিএনএন-নিউজ ১৮ চ্যানেলে শেখ হাসিনার এক সাক্ষাৎকার। যদিও এই সাক্ষাৎকারও তিনি ইমেল মারফত দিয়েছেন। তবুও কয়েকটি প্রশ্ন এবং হাসিনার জবাব ছিল বেশ নজরকারা।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে কোন সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য বা হুমকির ইঙ্গিত আপনাকে ঢাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল? নাকি এটা সত্যিকারের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা, কমান্ড কাঠামোর পতন, নাকি আপনার নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী থেকে নীরব সম্মতিতে “জোরপূর্বক প্রস্থান”? এর জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আগস্টের শুরুতে, একসময়ের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ আচমকাই উগ্রপন্থী আন্দোলনকারীদের একটি সহিংস জনতার নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলার অবনতি করতে বাধ্য করা হয়। এটা সিভিল সার্ভিস চাকরির কোটা নিয়ে প্রাথমিক ছাত্র বিক্ষোভের থেকে অনেক দূরে ছিল। ফলে এটা অবশ্যই গভীর এক ষড়যন্ত্র। তিনি আরও বলেন, ষড়যন্ত্রের সম্পূর্ণ মাত্রা অনেক পরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ইউনূস অভ্যুত্থান পরবর্তী সহিংসতায় জড়িত সমস্ত অপরাধীদের দায়মুক্তি দেন। এমনকি আমরা যে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার তা ভেঙে দেন। এর থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে আমার সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সিএনএন-নিউজ ১৮ কে তাঁর বাংলাদেশ ছাড়ার কারণ সম্পর্কেও বিস্তারিত বলেন। হাসিনার কথায়, আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে চাইনি, কিন্তু আমাকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে, এখানে থেকে গেলে কেবল আমার জীবনই বিপন্ন হতো না, বরং আমার আশেপাশের মানুষের জীবনও বিপন্ন হতো। সেই সময়ে, চলে যাওয়াটা ছিল বেঁচে থাকার ব্যাপার। এরপরই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার প্রস্থানের আলোচনায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কতটা জড়িত ছিলেন এবং আপনি কি বিশ্বাস করেন যে তিনি স্বাধীনভাবে, মার্কিন কূটনৈতিক চাপের অধীনে, নাকি রক্তপাত রোধে ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন? এর জবাবও যথেষ্ট কূটনৈতিক ভাবে দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সে সময় সামরিক বাহিনী এক অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল: জনতার ব্যাপক সহিংসতা থেকে একটি সাংবিধানিক সরকারকে রক্ষা করার পাশাপাশি আরও প্রাণহানি এড়ানো ছিল তাঁদের প্রাথমিক কর্তব্য। আমাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল আইন-শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ অবনতি রোধ করা এবং ঢাকার রাস্তায় আমার পরিবার, কর্মীদের এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাইরের চাপ সিদ্ধান্তগুলিকে প্রভাবিত করেছে কিনা বা কী ধরণের ছিল, আমি বলতে পারি না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে সাবধানী চাল দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। তিনি যেমন একদিকে মার্কিন প্রশাসনকে কাঠগড়ায় তুলছেন না, তেমনই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনীকেও খুব একটা চটাতে চাইছেন না। কারণ, তিনি জানেন এটাই সঠিক সময় বাংলাদেশে পুনরায় ঢুকে পড়ার। যতই তাঁর ফাঁসির সাজা হোক না কেন। গত বছর ৫ আগস্টের আগে-পরে জেনারেল ওয়াকারের বহু কর্মকাণ্ড পরবর্তী সময় সামনে এসেছে। তা থেকে মোটামুটি একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, তিনি দুদিকেই খেলছিলেন। একদিকে জেনারেল ওয়াকার তলে তলে বিক্ষোভকারী ও তাঁদের নেপথ্যে থাকা শক্তিগুলির সঙ্গে ছিলেন, তেমনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। শেখ হাসিনা ঠিক এই জায়গা থেকেই নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নিলেন ওয়াকার বিতর্ক থেকে।












Discussion about this post