ভারত কি সত্যিই শেখ হাসিনার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, বিএনপির জয় এবং তারেকের দলের প্রতি ভারতের একটু বেশি ঝুঁকে পড়া দেখে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অলিন্দে। কেউ কেউ বলছেন, এটি কেবল কূটনৈতিক ভারসাম্যের খেলা। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভারতের এক চালেই মাত হয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। তাই তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশের ধারণা ছিল, ভারত কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সম্পর্ক রেথে চলে। ফলে আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর সেই দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যখন বাংলাদেশের এক আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়, তখনও ভারত তাঁকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য রাজি হয়নি। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, বহু আগে থেকেই নয়া দিল্লি প্ল্যান বি নিয়ে কাজ করছিল। আর সেটা হল, আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে বেছে নেওয়া এবং তাঁদের সর্বোচ্চ নেতাকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। আর সেই কাজে ভারত শতভাগ সফল। আর এটাই কার্যত দাবার চালে মাত দেওয়া বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
প্রথমেই আসা যাক হাসিনা প্রসঙ্গে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে আসেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর থেকে তিনি ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। জানা যায় তাঁকে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় কোনও এক গোপন আস্তানায় রাখা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হল, হাসিনার অবস্থান বিগত দেড় বছরেও কেউ জানতে পারেননি। যদিও বিগত ছয়-সাত মাস তিনি দলের একাধিক নেতার সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা হাসিনার আস্তানা ও তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন। তাতেই বোঝা যায় হাসিনাকে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর সমতুল প্রোটকল এবং রাজকীয় মর্যাদায় রেখেছে ভারত সরকার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বাংলাদেশে ভোট হয়েছে আওয়ামী লীগকে ছাড়াই। আর তাতে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে থেকেই দেখা যাচ্ছে, নয়া দিল্লি কার্যত বিএনপির প্রতি একটু বেশিই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব দেখাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি ভারত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ল? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটা একেবারেই ঠিক নয়। যেটা জানা যাচ্ছে হাসিনাকে এবার কার্যত খোলা ছাড় দিচ্ছে ভারত সরকার। খুব সম্ভবত তিনি কয়েকদিনের জন্য এবার লন্ডনে যেতে পারেন তাঁর বোন শেখ রেহানা এবং ভাইজি টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে সময় কাটাতে। বিগত দেড় বছরে হাসিনাকে কোথাও খোলাখুলি যেতে দেওয়া হয়নি। এবার যদি তিনি লন্ডনে যান, তাহলে বলতে হবে হাসিনার বিপদ কেটে গিয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সুত্রে জানা যাচ্ছে, দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের বন্ধ থাকা কার্যালয় খুলে দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের প্রতি নরম মনোভাব নিতে দেখা যাচ্ছিল তারেক রহমানদের। ফলে আগামীদিনে আওয়ামী লীগের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলেও নিতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
অন্যদিকে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়েও নানা মহলে নানা কৌতুহল রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকাকালীন তিনি দেশে ফেরার কোনও সুযোগও পাননি। এমনকি হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন তাঁর বিরুদ্ধে থাকা যাবতীয় মামলা থেকে তারেককে রেহাই দেওয়া হয়েছিল তারপরও দেড় বছরে তিনি দেশে ফেরার নাম নেননি। এমনকি যখন তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তখনও তিনি দেশে ফেরা নিয়ে দাবি করেছিলেন এটা তাঁর একক সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু একমাসেরও কম সময়ে সবকিছুই ঠিকঠাক হয়ে গেল আর তারেক দেশে ফিরে এলেন। যেটা জানা যাচ্ছে, তারেকের সঙ্গে বিগত এক বছর ধরেই কথা চালিয়ে যাচ্ছিল ভারত। লন্ডনে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের উচ্চপদস্থ এক কর্তা অতি গোপনে তারেকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে গিয়েছেন। তাতেই সমস্যার সমাধান হয়। যখন বাংলাদেশ কার্যত জামাত ও কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠনগুলির দখলে চলে আসছে ঠিক তখনই বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন তারেক রহমান। এরপরের প্লট একেবারেই চিত্রনাট্যের মতো সাজানো ছিল। আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা না উঠলেও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নীরবে শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশে নব নিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মুখেও এখন ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে একটা ফিল গুড ব্যাপার।












Discussion about this post