ঐতিহাসিকভাবে ভারতের হাত ধরেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। এর ৫৪ বছর পর এসে সেই ভারতের পিঠেই ছুড়ি মারতে উদ্যত বাংলাদেশের বর্তমান শাসকরা। গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে বড়সড় পালাবদল হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগকে এক গণঅভ্যুত্থানের সাহায্যে মসনদ থেকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল নিয়েছে একটি শ্রেণি। যার মাথায় রয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূসের মতো এক নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। বিশ্বজোড়া যার খ্যাতি। কিন্তু পরবর্তী সময় জানা গেল, এই গণঅভ্যুত্থানের পিছনে রয়েছে গভীর এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। যাইহোক, মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর সে দেশের সাধারণ মানুষের মনে একটা আশা জেগেছিল যে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবার শিখড় ছোবে। কিন্তু আদতে তা হয়নি। বরং অতিরিক্ত ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে ক্রমশ ভারতের থেকে দূরে সরে গিয়েছে বাংলাদেশ। এবং এর প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে বাণিজ্যেও। মুহাম্মদ ইউনূস চিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, ল্যান্ডলকড ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের প্রয়োজন সমুদ্র বন্দর। আর তা একমাত্র রয়েছে বাংলাদেশের কাছে। তাই তিনি চিনকে আহ্বান করলেন, সেভেন সিস্টার্সের ভিতর দিয়েই বাংলাদেশে এসে সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করার জন্য। এই মন্তব্য যে ভারত খুব ভালোভাবে নেয়নি, তার প্রামান ছিল বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু তাতেও থামেননি মুহাম্মদ ইউনূস। তারপরও বারেবারে ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে গিয়েছেন। এবার নয়া দিল্লি সরাসরি বাংলাদেশের বাণিজ্যে আরেকটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করল। যার ধাক্কা সামলাতে এবার হিমশিম খেতে হবে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারকে।
যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পদ্মপাড়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল ভারত, সেই পাকিস্তানই এখন তাঁদের প্রিয় বন্ধু। তাই অপারেশন সিঁদুরে তছনচ হয়ে যাওয়া পাকিস্তানকে অক্সিজেন দিতে বাংলাদেশের তদারকি সরকার ফের উঠে পড়ে লেগেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের আর্থিক বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার বৃদ্ধির পরামর্শ দিলেন মুহাম্মদ ইউনূস, অথচ সেভেন সিস্টার্স বললেও তিনি মুখেই আনলেন না ভারতের নাম। চট্টগ্রামে দাঁড়িয়ে তিনি ঠিক কি বলেছেন, একবার শুনে নেওয়া যাক।
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার এ হেন বক্তব্য যে ভারত সরকার গুরুত্ব দিয়েই দেখছে তার প্রমান কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীনে থাকা বৈদেশিক বাণিজ্য দফতরের এক বিজ্ঞপ্তি। তাতেই হইচই পড়ে গিয়েছে দুই দেশে। শোরগোল শুরু হয়ে গিয়েছে ইউনুস প্রশাসনের অন্দরেও। কি বলা হয়েছে সেই বিজ্ঞপ্তিতে? মূলত স্থলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ভারত। অর্থাৎ, এখন থেকে ভারতের সব স্থল সীমান্ত বা বন্দর থেকে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্লাস্টিকের জিনিসপত্র, কাঠের আসবাব, রঙ কিছুই আর আমদানি করা যাবে না। তবে ওই সমস্ত সামগ্রী ভারত হয়ে নেপাল ও ভুটান যেতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু ভারত আমদানি বন্ধ করতেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করে দিয়েছেন বাংলাদেশের রফতানিকারক সংস্থাগুলি। বাংলাদেশের সংবাদ পত্র প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো-র হিসাব বলছে, ভারতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। যা বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশ ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। এর বড় অংশ শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য। আবার ভারতীয় ভোগ্যপণ্যের বড় বাজার হল বাংলাদেশ। বাংলাদেশি পণ্য রফতানির একটা বড় অংশ ইউরোপ ও আমেরিকা। কিন্তু ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ করায় এখন ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রকই স্বীকার করেছে কমবেশি ২০০০ কোটি টাকার ধাক্কা লেগেছে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল হওয়ায়। এবার বাংলাদেশকে আরও বড় ধাক্কা দিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। কারণ, ভারতে রফতানি করা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি যে পণ্য রয়েছে, যেমন রেডিমেড পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও পাণীয়, ফ্রুট জুস ইত্যাদি। বিশেষ করে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের বিস্কুট, চানাচুর, চিপস, ফ্রুট ড্রিংকস, পানীয়, শর্ষের তেল, কেক ইত্যাদি পণ্য বেশ ভালো মাত্রায় রফতানি হচ্ছিল। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকের আসবাবপত্রও রয়েছে এই তালিকায়। মোদি সরকার ঠিক এখানেই আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে শুল্ক স্টেশন ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানীয়, আসবাব, প্লাস্টিক পণ্য, সুতা ও সুতার উপজাত ইত্যাদি রফতানি করা যাবে না। অর্থাৎ যে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের এত মাথা ব্যাথা, বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য সেই সেভেন সিস্টার্সের দরজাই বন্ধ করে দিলেন নরেন্দ্র মোদি। এটা একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের থেকে কম নয় বলেই দাবি অর্থনীতিবিদদের। কারণ, এই সমস্ত পণ্যের জন্য ভারত স্থলবন্দর বন্ধ করার ফলে বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ আমদানিতে কোপ পড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতীয় মুদ্রায় এই সমস্ত পণ্যের বার্ষিক আমদানির মোট মূল্য সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, ভারতের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, স্থল বন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ করা হলেও কেবলমাত্র কলকাতা, হলদিয়া এবং মুম্বইয়ের নব সেবা সমুদ্র বন্দর দিয়ে এই সমস্ত পণ্য রফতানি করতে পারবে বাংলাদেশ। যা খরচ ও সময় সাপেক্ষ। তাই যে বন্দর নিয়ে ইউনূসের এত মাতামাতি, সেই বন্দরই এখন বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশের কাছে। আর ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই বাংলাদেশজুড়ে হইচই শুরু হয়েছে। চাপানউতোর শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কোনও পদক্ষেপের আগে এই ধরণের সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি সরকারের মাস্টারপ্ল্যানের অংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিয়ে অনেকটা পাকিস্তানের মতোই এগোচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।












Discussion about this post