বাংলাদেশ নিয়ে যে অভিযোগ ভারত প্রতিনিয়ত করে আসছিল, এবার সেটাই দেখা গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির সংবাদপত্রে। বাংলাদেশ যে ক্রমশ ইসলামিক জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, সেটাই তুলে ধরল যুক্তরাষ্ট্রের দি নিউ ইয়র্ক টাইমস। বলা হয়, এই পত্রিকায় গোটা বিশ্বের তাবড় তাবড় রাষ্ট্রনেতারা নিয়মিত চোখ রাখেন। কারণ, বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে নিউ ইয়র্ক টাইমস একটা ঐতিহ্যশালী নাম। সেখানে মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে যে প্রতিবেদন লেখা হয়েছে, তাতে শোড়গোল পড়েছে বাংলাদেশেও। ফলে তড়িঘড়ি ইউনূসের প্রেস উইং, বিবৃতি জারি করে দাবি করেছে, এই ধরণের প্রতিবেদন “বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয়”। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাই বলছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস উইং এই ধরণের বিবৃতি তখনই দেয়, যখন তার মধ্যে সত্যতা লুকিয়ে থাকে। আসুন একবার দেখে নেওয়া যাক, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশ নিয়ে ঠিক কি বলেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের শিরোনাম হল, “বাংলাদেশ যখন নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করছে, তখন ইসলামী কট্টরপন্থীরা একটি উন্মোচন দেখতে পাচ্ছে”। প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়েছে, চরমপন্থীরা নারীর শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু করেছিল। এরপর দুটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে ইসলামী চরমপন্থার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে। মহিলাদের ফুটবল ম্যাচ নিয়ে যে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধেছিল সেটা আর এক নারী নিগ্রহকারীকে যে ভাবে জনতা পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছিল সেই ঘটনা উল্লেখ করে। পাশাপাশি উদাহরণ দেওয়া হয়, রাজধানী ঢাকায় এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, যদি সরকার ইসলামকে অসম্মানকারী কাউকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়, তাহলে তারা নিজের হাতেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে। কয়েকদিন পর, একটি নিষিদ্ধ গোষ্ঠী ইসলামী খেলাফতের দাবিতে একটি বিশাল মিছিল বের করে। উল্লেখ্য এখানে ওই নিষিদ্ধ গোষ্ঠী হল হিজবুত তেহরী। মজার বিষয় হল, এককালে এই সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক ব্যক্তি এখন বাংলাদেশের তদারকি সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা। এবং তিনি সরকারের মধ্যে যথেষ্টই প্রভাবশালী। তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া দেন। বুধবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি অস্বীকার করেননি বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থা মাথাচারা দিচ্ছে। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের তদারকি সরকার এই ধরণের কোনও পরিস্থিতি বরদাস্ত করবে না। এটা নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। তবে যদি কোনও সংগঠন তাঁদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে সরকার কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, বাংলাদেশ যখন তাঁর গণতন্ত্র পুনর্গঠন করছে এবং দেশের জনসাধারণের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যত তৈরির চেষ্টা করছে, তখন দেশের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ মুখোশের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা ইসলামী চরমপন্থার ধারাটি ক্রমশ নিজেদের ফুটিয়ে তুলছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস স্পষ্টই বলছে, নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি করা নব্য রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে এই নথিটি বাংলাদেশের একটি সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেবে, এটিকে বহুত্ববাদ দ্বারা প্রতিস্থাপন করবে এবং দেশকে আরও ধর্মীয় ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করবে। ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইসলামপন্থী নেতারা জোর দিয়ে বলছেন যে বাংলাদেশে এমন একটি “ইসলামী সরকার” প্রতিষ্ঠা করা হোক যা ইসলামকে অসম্মানকারীদের শাস্তি দেবে এবং “শালীনতা” বলবৎ করবে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া তাঁর বিভিন্ন ভাষণে একই দাবি করেছেন। তিনি এমনও বলেছিলেন, যে মহিলারা তাঁকে এবং তাঁর সরকারকে ফেলে দিয়ে এক সময় জান প্রাণ দিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন কাদের ক্ষমতায় এনেছেন তাঁরা। নিউ ইয়র্ক টাইমস এরকমই এক তরুণী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের স্নাতক ২৯ বছর বয়সী শেখ তাসনিম আফরোজ এমি-র বক্তব্য উদ্ধৃতি করেছে এই প্রতিবেদনে। তিনি বলেছেন, “আমরা বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলাম। আমরা রাস্তায় আমাদের ভাইদের রক্ষা করেছি, এখন পাঁচ-ছয় মাস পর, পুরো ব্যাপারটা উল্টে গেল”। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, মহিলা ও শিশুদের ওপর হওয়া নির্যাতন, ধর্ষণ নিয়ে বারবার সরব হচ্ছে। সেই সঙ্গে বারবার বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বে়ড়ে চলা ইসলামিক কট্টরপন্থীদের দৌঁড়াত্ম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি ভারত সফরে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহাপরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডও বাংলাদেশের ইসলামিক টেরোরিজম নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এবার নিউ ইয়র্ক টাইমসও বাংলাদেশের ইসলামিক কট্টরপন্থার রমরমা বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন লিখল। যা নিশ্চই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর এড়াবে না। যা বাংলাদেশের কাছে আরও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
Discussion about this post