এক সময়ে বাংলার রোজকার জীবন অঙ্গ হয়ে উঠেছিল বোরোলিন। শীত পড়লেই ঠোঁটফাঁটা হোক বা চামড়ার টান, উপশম বোরোলিন। হাত বা পা কেটে গেছে, বোরোলিন লাগাও। সেই রেডিওর জমানা থেকে বোরোলিনের বিজ্ঞাপনে সেই সিগনেচার টিউন শুনে বড় হয়েছে কয়েকটি প্রজন্ম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে যা হয়, একসময় গুরুত্ব হারিয়ে পিছিয়ে পড়তে হয়। বোরোলিনের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বড় ব্র্যান্ডও অতীতের পাতায় চলে যায়। নোকিয়া ফোন তার বড় উদাহরণ। বোরোলিনও তাই। তবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বলে, বোরোলিন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং তাঁর পরামর্শ মেনে ওই সংস্থা নতুন করে জীবন পেয়েছে। ফুলে ফেঁপে উঠেছে তাঁদের ব্যবসা। আর এই কথা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন সর্ব সমক্ষে।
ইংরেজদের বঙ্গভঙ্গের চক্রান্ত আটকানো গিয়েছে। রুখে দেওয়া গিয়েছে বাঙালি বিপ্লবীদের অদম্য লড়াইয়ের জন্য। গোটা বঙ্গে তখন স্বদেশি আন্দোলনের হাওয়া। ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’। বিদেশী পণ্য বর্জন করে স্বদেশি পণ্য আপন করে নিতে শুরু করল তৎকালীন বাঙালি। ঠিক সেই সময়ই বাজারে এল এক বিশেষ অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম। বোরিক অ্যাসিড ও অন্যান্য কিছু বিশেষ ভেজস তেল দিয়ে তৈরি সেই ক্রিম, নাম বোরোলিন। সেই ১৯২৯ সালে গৌরমোহন দত্তের হাত ধরে শুরু বোরোলিনের যাত্রা। বিদেশি ক্রিমের বদলে দেশি অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওই বাঙালি উদ্যোগপতি। ৯৬ বছর পেরিয়েও যা আজও জনপ্রিয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার ১৯২৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯৬ বছরের ব্যবসায় একদিনও সরকারি কোষগার থেকে অর্থসাহায্য নেয়নি উৎপাদনকারী সংস্থা। সেই সংস্থা যখন ধুঁকছে, তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এগিয়ে এলেন উপযুক্ত পরামর্শ নিয়ে। তাঁর দাবি, আগে মেয়েরা, এমনকি ছেলেরাও ব্যবহার করতেন। সেটা একটু মোটা, মানে ভারী টাইপের ছিল। আমি একদিন ওদের ডাকলাম, বললাম এটাকে হালকা করো। আর তুমি জ্যাসমিন, ভেসলিন, ভ্যানিলা করো। দেখবেন পাতলা পাতলা, মেয়েরা যাতে ছোট ব্যাগে রাখতে পারে।
জানা যায়, ২০২৩ সালের অগাস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, বোরোলিনের ক্রিম আঠার মতো লাগত। অরূপ বিশ্বাসের মাধ্যমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বোরোলিনের কর্তাদের। এরপর বোরোলিন কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। যা মেনে ওই সংস্থা বোরোলিনকে আরও আধুনিক ও যুগপোযোগী করে তুলেছেন। ফলে বোরোলিনের বিক্রি হু হু করে বেড়ে গিয়েছে। বৃহস্পতিবার ‘শিল্পান্ন’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছে আরও একবার বোরোলিনকে দেওয়া তাঁর পরামর্শ ও বিক্রি বাড়ার কথা ফলাও করে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ, তাঁর একটি টিপস প্রায় শতাব্দী ছুঁতে চলা একটা সংস্থাকে বাঁচিয়ে দিল। আর বাংলার বোরোলিনও আধুনিক হয়ে পৌঁছে গেল বিশ্ব দরবারে।












Discussion about this post