অবশেষে জগন্নাথ মন্দির তো তৈরি হল বাংলার অন্যতম সৈকত নগরী দিঘায়। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে উপস্থিত থেকে জগন্নাথ দেবের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করলেন অক্ষয় তৃতীয়ার আগের দিন। আর অক্ষয় তৃতীয়ার দিন মন্দির উদ্বোধন করলেন তিনি। বাঙালির প্রমোদ ভ্রমণের একমাত্র জায়গা দিঘার মুকুটে যুক্ত হল আরও একটি স্বর্ণ মুকুট। ফলে দিঘা আর শুধুমাত্র প্রমোদ ভ্রমণের জায়গা থাকলো না। দিঘা হয়ে উঠল তীর্থ ক্ষেত্র। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কী প্রাণ হারাতে চলেছে সদা প্রাণচঞ্চল পুরী? অর্থাৎ জগন্নাথ মন্দির তৈরি হওয়ার পর দিঘা কী পুরীর বিকল্প হয়ে উঠবে?
বলা যায় পুরীগামী পর্যটকদের দিঘামুখী করতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। তাই উদ্যোগ নিয়ে দিঘায় পুরীর আদলে জগন্নাথ মন্দির তৈরি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মন্দিরের আদল ও উচ্চতাও পুরীর মন্দিরের সমান। নিউ দিঘা স্টেশন লাগোয়া ভগীব্রহ্মপুর মৌজার বিস্তীর্ণ উঁচু বালিয়াড়ির ওপর গড়ে উঠছে এই জগন্নাথধাম। প্রথমে ১২৮ কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শেষ পর্যন্ত তা বেড়ে ২৫০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত বিশাল জাকজমক ও আড়ম্বরে দিঘার জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন হল। পর্যটকদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা চোখে পড়ার মতো। এই মুহূর্তে দিঘায় নতুন জগন্নাথ মন্দির দেখার জন্য ভিড়ও হয়েছে ব্যাপক। কিন্তু তা কী পুরীকে টেক্কা দিতে পারবে?
পর্যটকদের একাংশ বলছেন, পুরীর মহাত্ম দিঘায় কোথায়! পুরী হল ভগবান জগন্নাথের বাসস্থান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, হিন্দু পুণ্যর্থীরা জগন্নাথ পুরীর মন্দিরকে শ্রদ্ধা করে আসছে। এটি চার ধামের অন্যতম। কথিত আছে যেখানে ভগবান বিষ্ণু থাকেন, সেখানেই ভগবান শিব থাকেন। তাই ভারতের চার দিকে চারটি ধাম স্থাপন করেছিলেন আদি গুরু শঙ্করচার্য। উত্তরে বদ্রীনাথ ধাম, তাঁর পাশেই শিবের বাসস্থান কেদারনাথ। পশ্চিমে দ্বারকা ধাম, তাঁর পাশের সোমনাথ মন্দির। দক্ষিণে রামেশ্বরম যার পাশেই রঙ্গনাথস্বামী মন্দির। আর পূর্ব দিকে শ্রীক্ষেত্র পুরী, যার পাশেই লিঙ্গরাজ মন্দির। হিন্দু ধর্মে ধামের মাহাত্ম্য অনেক। তাই তার ধার্মিক ভাব প্রকাশ অনেকটাই বেশি হবে।
দীঘায় রাজ্য সরকারের উদ্যোগে নির্মিত জগন্নাথ মন্দিরটি যদিও জগন্নাথ ধাম বলা হচ্ছে, আদতে তা নয়। কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে গ্রথিত হয়ে রয়েছে, তা শ্রীক্ষেত্র পুরীকে কেন্দ্র করেই। দীঘায় যতই জগন্নাথ মন্দির তৈরি হোক না কেন মনের টানে, প্রাণের টানে, জগন্নাথ দেবের টানে পুন্যার্থীরা পুরীতেই ছুটবেন মনস্কামনা পূর্ণ করতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন দীঘায় জগন্নাথ মন্দির স্থাপন আসলে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিন্দু ভোট টানার একটা উপায় মাত্র। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোট দিনের পর দিন বাড়ছে। আসন কম হলেও শতাংশের বিচারে বিজেপির ভোট অনেকটাই টেক্কা দিচ্ছে তৃণমূলকে।
এদিকে রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীতে রাজ্যজুড়ে যে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রা বের হচ্ছে তাতেই সিদুরে মেঘ দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে রামনবমীতে তিনি একসময় শোভাযাত্রা বের হতে দিতেন না, আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হতো বিজেপিকে। সেই রামনবমীতেই এখন তৃণমূলের তরফে শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে। এটা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তাই পুরীর আদলে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করে একদিকে যেমন পর্যটক টানার একটা প্রচেষ্টা রয়েছে তেমনই এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। সেই কারণেই দুদিন ধরে গোটা রাজ্যজুড়ে লাইফ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে দীঘার জগন্নাথ মন্দিরে বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা, মহাযজ্ঞ ও উদ্বোধনের পালা দেখানোর ব্যবস্থা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। যাতে প্রমাণ করা যায় তারাও যথেষ্ট হিন্দুত্ববাদী।












Discussion about this post