এই মুহূর্তে বঙ্গ রাজনীতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, দিলীপ ঘোষ কি তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে বাজি রাখলেন? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে দিঘায় গিয়েছিলেন সস্ত্রীক দিলীপ ঘোষ। যেখানে বঙ্গ বিজেপির বহু নেতারও আমন্ত্রণ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাঁরা সেদিকে পা মাড়াননি। কিন্তু দিলীপ ঘোষ গেলেন। তারপরেই নিজের দলে তিনি কোনঠাসা। যদিও তাতে কিছু যায় আসে না দিলীপ ঘোষের। প্রথম থেকেই সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলে আসা দিলীপবাবু আজও নিজের কৃতকর্ম নিয়ে কোনও অনুশোচনা দেখাচ্ছেন না। বরং বঙ্গ রাজনীতিতে তিনি একটি নতুন শব্দ যোগ করে দিলেন, সেটা হল “হটাৎ বিজেপি নেতা”। বোঝাই যাচ্ছে তাঁর তির তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতারা। যারা আজ কেউ সাংসদ বা কেউ বিরোধী দলনেতা।
এবার আসা যাক প্রথমেই করা প্রশ্নের উত্তরে। দিলীপ ঘোষ সস্ত্রীক দিঘা সফর এবং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে হাসিঠাট্টার ঘটনার পর থেকে ভোট বছরে কাদা মাখামাখি অবস্থা গেরুয়া শিবিরে। বঙ্গ বিজেপির এমন কোনও নেতা নেই যিনি দিলীপের সমালোচনা করতে ছাড়ছেন না। এমনকি কেউ কেউ আবার দিলীপ ঘোষকে ব্যক্তিগত আক্রমণও করছেন। যেমন বিজেপির আমুদে বিধায়ক অসীম সরকার, তিনি ‘দিঘায় দিলীপদার হানিমুন’ বলে কটাক্ষ করেছেন। আবার বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন “একজন ত্যাগী থেকে কিভাবে ভোগী হতে হয় তার আদর্শ নিদর্শন আপনি দিলীপবাবু”। এরকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। ব্যারাকপুরের প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ অর্জুন সিং প্রকাশ্যেই দাবি করছেন, কুণাল ঘোষের মাধ্যমে দিলীপ ঘোষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেটিং করছেন। তাঁর দাবি, দলও এটা জানে।
নব্য বিজেপি নেতা সজল ঘোষ, তিনিও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি দিলীপ ঘোষকে। তাঁর দাবি, বড় নেতারা যখন ভুল করে তখন ছোট নেতাদের কৈফিয়ত দিতে হয় রাস্তাঘাটে, কর্মীদের সামনে। দিলীপ ঘোষ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা তথাগত রায় তো বলেই ফেললেন, দিলীপ ঘোষের এই কর্মকাণ্ড দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায় যে তিনি তৃণমূলে হয় চলে গিয়েছেন অথবা পা বাড়িয়ে বসে আছেন। দিলীপ ঘোষ, যিনি প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, যার আমলেই বিজেপির বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছে এই রাজ্যে। সেই দিলীপ ঘোষ দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নিয়ে ঝড় উঠছে বঙ্গ বিজেপিতে। কিন্তু বরাবরই ঠোঁটকাটা দিলীপবাবু এর যোগ্য জবাবও দিচ্ছেন। তাঁর নিশানায় বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতারা। যাদের কেউ কেউ এখন বিধায়ক বা সাংসদ হয়েছেন। আবার কেউ কেউ ভোটে হেরেছেন। দিলীপ ঘোষ তাঁদের জন্য এক নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করেছেন “হটাৎ বিজেপি নেতা”।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দিলীপ ঘোষ কেন এমন কাজ করলেন? যেখানে রাজ্য বিজেপির অন্দরেই কানাঘুঁষো ছিল সুকান্ত মজুমদারের পর তাঁকেই ফের রাজ্য সভাপতি করা হতে পারে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর কাঁধেই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। কিন্তু যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিনরাত এক করে বিজেপি নেতারা তুলোধনা করছেন, যে তৃণমূলের হাতে প্রতিনিয়ত বিজেপি কর্মী, সমর্থক ও নীচু তলার নেতারা লাঞ্ছিত হচ্ছেন, মার খাচ্ছেন অথবা প্রাণ হারাচ্ছেন সেই তৃণমূলের সঙ্গে কেন এত গলাগলি ভাব দেখালেন দিলীপ ঘোষ। বিজেপি সূত্রের খবর, এটা ভালোভাবে নেয়নি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস। জানা যাচ্ছে, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা ও আরএসএসের যৌথ সাধারণ সম্পাদক অরুণ কুমারের মধ্যে শুক্রবার এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
আপাতত ঠিক হয়েছে, দিলীপ ঘোষকে বিজেপির কোনও বৈঠকে ডাকা হবে না। আগামী ৬ মে বিজেপির রাজ্য স্তরের বৈঠক রয়েছে। সেই বৈঠকে দিলীপ ঘোষকে না ডাকারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রে খবর। কিন্তু দিলীপ ঘোষের মনোভাব ঠিক উল্টো। তিনি এসব পাত্তা দিতেই নারাজ। বরং তাঁর টার্গেট নব্য বিজেপি নেতারা। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা অংশের মনে প্রশ্ন জাগছে, তাহলে কি আরএসএসের ইচ্ছাতেই দিলীপ ঘোষ দিঘায় গিয়েছিলেন? আসলে এই মুহূর্তে রাজ্য বিজেপির অন্দরে “হটাৎ বিজেপি” নেতাদের উত্থান উল্কার মতো হয়েছে। যারা কোনও দিন বিজেপি বা আরএসএস করেননি, তাঁরাই এখন বঙ্গ বিজেপিতে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। তাঁদের দৌঁড় কতটা এবং তাঁরা কতটা দলীয় লাইন মেনে চলেন, সেটা পরীক্ষার জন্যই আবাল্য আরএসএস করা দিলীপ ঘোষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কিনা সেটাও এখন আতসকাঁচের নীচে রয়েছে। ফলে দিলীপ দা অনড়, কারণ তিনি পুরোনো বিজেপি এবং আরএসএসের যোদ্ধা।












Discussion about this post