ভারতের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যা উদ্ভুত হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অস্থিরতা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশের। গত বছরের জুন-জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া এই অস্থির পরিবেশ আবার নতুন করে হাওয়া পেল বিগত কয়েকদিনে। আর তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এবার সরাসরি অভিযোগের আঙুল উঠল ভারতের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের পালাবদলের কাণ্ডারী হিসেবে দাবি করা একদল ছাত্র যা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে একটি ব্যানারে কাজ করছিল, তাঁরাই পর্যায়ক্রমে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং সবশেষে এক রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করেছে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেথ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাঁদের যত রাগ। যেহেতু হাসিনা এখন ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে, সেহেতু এই ছাত্র নেতাদের যত রোষ ভারতের ওপর।
কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানান আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় নাগরিক পার্টি তা মেনে নিতে পারছিল না। আর আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের এই প্রয়াস নাকি ভারতের চক্রান্ত এমন দাবি করে বসলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির এক সংগঠন হাসনাত আবদুল্লাহ। যদিও তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, কিন্তু তাঁর ফেসবুক পোস্টে সরাসরি ভারতের চক্রান্তের কথাও উল্লেথ রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর এই ফেসবুক পোস্টের একটা অর্থ করাই যায় যে ভারত এখন সরাসরি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। আবার এটাও বলা যায়, ভারত এখন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে অভিযোগের মাত্রাটা আলাদা গুরুত্ব বহন করছে বৈকি। শুধু হাসনাত নয়, বাংলাদেশের তদারকি সরকারের এক তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও এক ভিডিও বার্তায় সরাসরি আঙুল তুলেছেন সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের দিকে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এবং বিশিষ্টজনদের দাবি, কোনও এক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের তরফে এই প্রথম দেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আঙুল তোলা হল। যা দেশের ঐক্য এবং অখণ্ডতাকে বিনিষ্ট করতে পারে। জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্যতম মুখ এবং দক্ষিণবঙ্গের সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রতি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অবমাননাকর এবং অপমানজনক পোস্ট দিয়েছেন ফেসবুকে। তদারকি সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ আবার আরও সুর চড়িয়ে সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনলেন। এখানেই শেষ নয়, জাতীয় নাগরিক পার্টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাতভর ধর্ণা ও মিছিল করে সেনাপ্রধান ও বাহিনীর বিরুদ্ধে নানারকম স্লোগান দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ফেসবুকে হুমকিও দিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যেন সেনাবাহিনী বা পুলিশের পা না পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় নাগরিক পার্টির এহেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং অপমানকর অভিযোগের পর সেনাবাহিনী কী চুপ করে বসে থাকবে, না নিরবে সবটা মেনে নেবে? যদি সেনাবাহিনী তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং অপমানের জবাব না দেয়, তবে সেটা কেন? এই ধরণের প্রশ্ন এবং আলোচনা এখন বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে।
সেনাবাহিনী যে একেবারেই নিশ্চুপ নয়, তার প্রমান ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় শহরে। রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি বেশ থমথমে। সেখানকার বাসিন্দাদের বক্তব্য, শুক্রবার বিকালের পর শহরে সেনাবাহিনীর তৎপরতা অন্য সময়ের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। নতুন করে বাহিনী মোতায়েন হয়েছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে। জানা যাচ্ছে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভেতরেও সেনাবাহিনী সন্ধ্যের পর থেকে টহল দেওয়া শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতি বিগত কয়েক মাসে দেখা যায়নি বলে দাবি এলাকার বাসিন্দাদের। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালের মতো বিভাগীয় শহরগুলিতেও সেনার তৎপরতা বেড়ে গিয়েছে। এমনটাও শোনা যাচ্ছে, ঢাকা লাগোয়া ক্যান্টনম্যান্টগুলি থেকে অতিরিক্ত বাহিনীকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ এমনটাও মনে করছেন, খুব শীঘ্রই সেনাবাহিনী ইউনুস সরকারকে হটিয়ে দেশের ভার নিজেদের হাতে নিতে পারে। কিন্তু আচমকা কি এমন হল যে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সদ্য গজিয়ে ওঠা রাজনৈতিক দল এতটা গালমন্দ শুরু করল? আবার যে মুহাম্মদ ইউনূসকে তাঁরা সাদরে ডেকে নিয়ে এসে বাংলাদেশের ভার তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন, সেই ইউনূসকেও এখন ছেড়ে কথা বলছেন না!
ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনরায় স্থান দেওয়ার যে কথাবার্তা চলছে, তাতেই ক্ষেপে গিয়েছে তরুণ এই নেতারা। শুক্রবার বিকেলে তাঁরা একটা সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানেই তাঁরা পরিস্কার করে দিয়েছেন তাঁদের অবস্থান। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তো সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে তিরস্কার করলেন। তাঁর কথায়, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাই।
সেই সঙ্গে তিনি এও জানান, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনও স্থান নেই। তাঁরা সেটা মেনেও নেবেন না। এর জন্য যতদূর যেতে হয় তাঁরা যাবেন। এমনকি সেনাবাহিনীর প্রতিও তিনি বিরূপ মন্তব্য করেন। অপরদিকে যে হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর ফেসবুক পোস্টে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন, এদিন তিনিও ফের সেই সপক্ষে যুক্তি সাজালেন। তবে তিনি এবারও সেই সেনাকর্তার নাম প্রকাশ্যে আনেননি। যা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, হাসনাতের কথা সত্যি হয়ে থাকলে সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিনদের বিষয়ে শেখ হাসিনা কি ওয়াকিবহাল? আওয়ামী লিগ কি ভেঙে যাচ্ছে? এই ব্যাপারে আওয়ামী লিগ নেতারা কোনও মন্তব্য করতে চাননি। যোগাযোগ করা হলে তাঁদের অনেকেই বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে কোনও নেতাকে দল পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন বলে তাঁদের জানা নেই। ফলে এখন দেখার, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে স্থির হয়।











Discussion about this post