মুর্শিদাবাদের অশান্তি নতুন কিছু নয়। ফি বছর পশ্চিমবঙ্গে এরকম দুই একটি দাঙ্গা হতে দেখা গিয়েছে। প্রশ্নটা সেখানে নয়, প্রশ্নটা হল পশ্চিমবঙ্গ কি ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য, নাকি দেশের মধ্যে একটা দেশ?
পশ্চিমবঙ্গ ‘দাঙ্গা’ দেখেনি এমনটা নয়। স্বাধীনতার আগে থেকে শুরু করে এই ২০২৫ সাল পর্যন্ত বহু ছোট বা বড় সাম্প্রদায়িক হিংসা এই বাংলার মানুষ দেখেছেন। বিশেষ করে গত এক দশকে। বসিরহাট থেকে শুরু করে উলুবেড়িয়া, আসানসোল, ভাটপাড়া, রিষড়া, কালিয়াচক — হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। তাহলে মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনা নিয়ে এত চর্চা কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে বেশ কয়েকটি গভীর তাৎপর্য খুঁজে পাচ্ছেন। তাই মুর্শিদাবাদের ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত সরকার, উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক মহলের একাংশ, পাশাপাশি চিন্তিত অতি সাধারণ বাঙালি। একমাত্র বিপরীতমুখী চিন্তা করছে রাজ্যের শাসক দল।
‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি’, এই স্লোগান তুলে তথাকথিত উদারপন্থী সমাজ বা সেকুলার হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক শ্রেণীর মানুষ বিগত কয়েক দশক ধরে বুক চিতিয়ে বাংলার মাটিতে ঝড় তুলে চলেছে। তাদের ভাবখানা এমন, বাঙালি মাত্রই সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে সাম্প্রদায়িক হানাহানি একদমই বরদাস্ত করা হয় না। কিন্তু আমরা জানি, মুখে যতই বুলি ফুটুক না কেন, অন্তরে একটা ভক্তি গদগদ ব্যাপার বা সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সযত্নে লালিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে তৃণমূল স্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে। তাইতো প্রতি শনিবার শনি মন্দির হোক, বা সোম মঙ্গলবার শিব বা হনুমান মন্দিরের লাইন সেই বিষয়টি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অপরদিকে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জুম্মার নামাজ সেই দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে বাইরে থেকে ধর্মনিরপেক্ষ, আর ভিতরে ভিতরে ধর্মপ্রাণ বাঙালি প্রতিদিনই চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে এসেছে। বিগত বাম জমানা অতীত, তাই সে সময়ের হিসেব কষে লাভ নেই। শেষ এক দশকের কিছুটা বেশি সময় পরিবর্তনের সরকার রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার বাঙালির মনে প্রাণে কতটা পরিবর্তন আনতে পারলো? আজ বরং সেই অঙ্কই কষা যাক।
বাংলার জনগণ যতই নিজেদের উদারবাদী ভাবুক না কেন, অধিকাংশ মানুষের মনের গভীরে একটি সাম্প্রদায়িক মানসিকতা গাঁথা রয়েছে এ কথা অস্বীকার করা যায় না। দরকার ছিল সেই ভিতটা নাড়ানোর। আর এই কাজটাই শুরু করেছে বঙ্গ বিজেপি। ২০১১ সাল থেকে হিজাব পরা নেত্রীর ছবিই হোক বা ইমামদের দিয়ে রাজনৈতিক সভা আলোকিত করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি হোক, এটা দেখেই চোখ সয়ে গিয়েছিলো আপাত নিরীহ আম বাঙালির। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে রামনবমীর শোভাযাত্রায় অস্ত্রের ঝনঝনানী দেখে কিছুটা হলেও চোখ ছানাবড়া হয়েছে সেই নিরীহ বাঙালির। বুকে সযত্নে লালিত সাম্প্রদায়িক মানসিকতা এবার বেরিয়ে আসতে শুরু করলো। আর এতেই ভিত নড়ে গেল। সেই সঙ্গে টলতে শুরু করল তৃণমূল কংগ্রেসের মিথ। কারণ, বঙ্গ বিজেপি গত বিধানসভা নির্বাচনে যত আসন জিতেছিল তার থেকেও বেশি ভোট অর্জন করেছিল। অর্থাৎ নিজস্ব ভোটব্যাঙ্কের পাশাপাশি ৪-৫ শতাংশ বাড়তি ভোট জুটিয়ে নিয়েছিল পদ্ম শিবির। গত লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপি বিধানসভা ভিত্তিক অনেক বেশি আসনে এগিয়ে গিয়েছে। যা নিশ্চই চিন্তায় ফেলেছে রাজ্যের শাসকদলকে।
বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দাবি , তৃণমূলের অত্যাচার ও সন্ত্রাস সত্ত্বেও ৩৮-৪০ শতাংশ ভোটার বিজেপিকে ধারাবাহিক ভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন। এটা আরো কয়েক শতাংশ বাড়াতে পারলে পশ্চিমবঙ্গে ফের পালাবদল সম্ভব। তাই একদিকে যেমন হিন্দুত্বের প্রচার চলছে, অন্যদিকে সামাজিক আন্দোলনের ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব।
অনেকে গত বিধানসভায় তৃণমূলের ২১৫ আর বিজেপির মাত্র ৭৭ আসনকে কে সাম্প্রদায়িক শক্তির পরাজয় ভেবে উল্লসিত হয়েছিলেন। তাঁরা হয়তো জেনে বুঝেও অস্বীকার করছিলেন যে, এই বাংলা থেকে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা সাফ হয়ে গিয়ে বিজেপি প্রধান বিরোধী দলের জায়গা করে নিয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে ৭৭টি আসন পেয়েছিল। আর ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে প্রায় একশোটির কাছাকাছি বিধানসভা আসনে বিজেপি প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। অর্থাৎ বিজেপির পাল্লা ভারী হচ্ছে দিনে দিনে। এটাই সিঁদুরে মেঘ হিসেবে দেখছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। আসলে বিজেপি বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ের এক ফোঁটাও ধক নেই তৃণমূলের। আর না থাকার কারণ হচ্ছে দলটি ‘যখন যেমন তখন তেমন’ পদ্ধতিতে চলে। যেমন, যে দল ২০১৭ সালে রামনবমীর আগ্রাসী অস্ত্র মিছিলের বিরোধিতা করে হনুমান জয়ন্তীর ঢল নামায় এবং ২০২৫-এ এসে নিজেরাই রামনবমীর মিছিল বের করে। আবার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দিঘার জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের জাঁকজমক। রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে প্রতিটি মোড়ে কোথাও বিগ স্ক্রিনে মন্দির উদ্বোধনের লাইভ স্ট্রিমিং চালিয়ে বা কোথাও মাইক বেঁধে নিরন্তর প্রচার করে তৃণমূল বোঝানোর চেষ্টা করেছে তারাও হিন্দুত্বের লাইনে রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ধর্ম যদি রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়, তখন মুর্শিদাবাদের মতো হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতেই পারে। যেখানে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান নিজেই ঘোষণা করেন ওয়াকফ আইন তাঁর রাজ্যে লাগু হবে না। যে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ওয়াকফ আইন নিয়ে হুমকি দেন, যে প্রথমে জেলা ও শেষে কলকাতা অবরুদ্ধ করে দেওয়া হবে। সেখানে যে আইনের শাসন থাকবে না এটা বলাই বাহুল্য।










Discussion about this post