শিক্ষক নিয়োগ থেকে আর জি কর কাণ্ড, এবার প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল। বারে বারে অভিযুক্ত রাজ্য সরকার। সেই সঙ্গে অভিযোগের তির শাসকদল তৃণমূলের দিকে। তবুও কমে না শাসকের আস্ফালন, আর দোষী হন অন্যরা।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে”। আসলে বিচার হয় তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে আইনের চশমায় পরখ করে। তাই কোনও অপরাধ হলে পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব থাকে সেই অপরাধের অপরাধীদের খুঁজে বার করে প্রমানাদি সহ তাঁদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু আমাদের পশ্চিমবঙ্গে সেই অবকাশ কোথায়? সিংহভাগ ক্ষেত্রেই যেখানে অভিযুক্ত শাসক নেতা বা মন্ত্রী। তাই পুলিশ, প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকে, আর আইনের পরীর চোখে তখন প্রকৃতই কালো কাপড় বাঁধা থাকে। কারণ, মহান শাসক কখনও দোষী হতে পারে না। শাসককত্রী হুঙ্কার দেন, “চোপ, সবটাই রাজনীতি”। ব্যাস, বিচারের আগেই বিচার হয়ে গেল। রাজ্যের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পাহাড় প্রমান দুর্নীতির অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রী-সহ এক সময়ের গোটা শিক্ষা দফতরই কারান্তরে ছিল বা রয়েছে। তবুও শাসক শিবির এখানে রাজনীতি খোঁজে, বুক ফুলিয়ে দাবি তোলে সবই বিজেপি ও বামেদের চক্রান্ত। রাজ্যের অন্যতম প্রধান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর জি করে যখন এক কর্তব্যরত তরুণী চিকিৎসক ধর্ষিতা হয়ে খুন হলেন তখনও সেটা ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা হল। প্রমান লোপাট করতে মৃতা চিকিৎসকের বৃদ্ধ বাবা-মাকে পর্যন্ত ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখা হল। আর জি কর হাসপাতালে পৌঁছে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, অধ্যাক্ষকে অন্যত্র বদলি করলাম। যেখানে অধ্যাক্ষ নিজেই অভিযুক্ত। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই গ্রেফতার করলেন আর জি করের অধ্যাক্ষ সন্দীপ ঘোষ ও সেখানকার দায়িত্বে থাকা পুলিশ আধিকারিক অভিজিৎ মণ্ডলকে। অর্থাৎ পুলিশ ও প্রশাসন এখানে অভিযুক্ত। আর জি কাণ্ড নিয়ে গোটা রাজ্য উত্তাল হল, রাত দখল থেকে রাস্তা দখল নানান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দেখলো বিশ্ব। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী দেখলেন সবই বিরোধীদের চক্রান্ত। ক্ষমতা দখল করতেই নাকি বাম ও বিজেপি হাত মিলিয়ে মানুষ খেপাচ্ছে। কিন্তু হাজার প্রশ্ন অসম্পূর্ণ রেখেই তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় একজনই দোষী সব্যস্ত হলেন। অন্যদিকে সোদপুর পানিহাটিতে নিজের ঘরে বসে সন্তান হারানো বৃদ্ধ বাবা-মা কাঁদছেন আর বলছেন, “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে”। কারণ এখনও অধরা সেই প্রশ্ন, দোষ কার আর দোষী হলেন কে!
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে এক ধাক্কায় চাকরি গেল প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীর। অভিযোগ ছিল, দুর্নীতির, ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার। কিন্তু ২০১৬ এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়া এই ২৫ হাজার ৭৫৩ জনের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যোগ্য ও মেধাবী। কিন্তু অযোগ্য বা দুর্নীতির মাফমে চাকরি পাওয়া বাকিদের সঙ্গে তাঁদেরও চাকরি গেল। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করেছে, কোনও উপায় ছিল না যোগ্য ও অযোগ্যদের আলাদা করার। বিচারপতিরা এখানে অসহায়, কারণ তাঁরা তথ্য প্রমান ও আইনের আওতায় বিচার করেন। কিন্তু রাজ্য সরকার, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এবং এসএসসি কেউই ঠিকঠাক অযোগ্যদের আলাদা করার উদ্যোগ নেয়নি করোও অঙ্গুলিহেলনে। অভিযোগ, এই অযোগ্যদের সিংহভাগ শাসকদলের নেতাদের ঘুষ দিয়েই চাকরি আদায় করেছিল, তাই তাঁদের চাকরি বহাল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে শাসক শিবির। আর এই কারণেই সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করতে হল হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টকে। যদিও হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চ থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ একাধিকবার সুযোগ দিয়েছিলো অযোগ্যদের তালিকা জমা করতে। এসইসসি ও সিবিআই আলাদা আলাদা তালিকা জমাও করেছে। তবুও সমস্যা রয়ে গেল সরকারের সদিচ্ছার অভাবে। ফলে সেই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদল।
Discussion about this post