থ্যাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবেই বৈঠকে বসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এটা তাঁদের প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। যদিও শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এই বৈঠকের বিষয়ে ঘ্রুণাক্ষরেও জানায়নি ভারত এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু বৈঠক হল। কারণ, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে বারবার ইউনূস ও মোদির মধ্যে একটি বৈঠকের আর্জি জানানো হচ্ছিল। শুক্রবার সেই আর্জিতে সাড়া দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বসলেন বৈঠকে। কিন্তু ঠিক কি কি বিষয় নিয়ে আলোচনা হল, সেটার আভাস পাওয়া গেলেও রয়ে গিয়েছে ধোঁয়াশা।
উল্লেখ্য বৃহস্পতিবার থেকেই বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলি দাবি করতে শুরু করে বৈঠক হচ্ছে। তবে তখনও ভারত সরকার এ ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। শুক্রবার সকালেও ভারত কিছু জানায়নি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বসলেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলি সেই বৈঠক নিয়ে প্রবল উৎসাহে খবর করলো। প্রায় প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যমের হেডলাইন হল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যবর্তন চাইলো বাংলাদেশ। এমনকি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সচিব শফিকুল আলামও সাংবাদিকদের সামনে দাবি করলেন শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন চাওয়া হয়েছে নরেন্দ্র মোদির কাছে। তিনি এও দাবি করলেন এই বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসু।
কিন্তু বেলা বাড়তেই তাঁদের এই উৎসাহে জল ঢালল ভারত। বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি এক এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্বীকার করলেন বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন চেয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি এও বললেন এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য তিনি করবেন না। ভারতের বিদেশ সচিবের আরও দাবি, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সে দেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের কাছে ক্ষোভ উগড়ে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পড়শি দেশে উগ্র ইসলামিক জঙ্গিবাদী এবং ভারত বিরোধী শক্তির উত্থান নিয়েও ইউনুসকে ভারতের ক্ষোভের কথা জানান মোদি।
এখানেই শেষ নয়, বিমসটেক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদি যে যে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন প্রত্যেকের সঙ্গে ছবি সহ কিছু কথা তার নিজের সমাজ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। মুহাম্মদ ইউনুস ছাড়াও নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেছেন মিয়ানমারের সেনা শাসক জুন্টা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন আং হ্লাইংয়ের সঙ্গে। মোদি তাঁর সঙ্গে কয়েকটি ছবি শেয়ার করে লিখলেন ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের কথা।ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অগ্রগতির কথা। একইভাবে মোদি শেয়ার করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে বৈঠকের ছবি। তাঁর সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গেও ভারত-নেপাল সুসম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের পার্টনারশিপ নিয়ে। ভূটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সারমর্ম তুলে ধরেন মোদি। তাঁকে খুব ভালো বন্ধু বলেও উল্লেথ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ছবি সবার শেষে শেয়ার করেন নরেন্দ্র মোদি। এবং সেখানে তিনি যা লিখলেন তা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। মোদি লিখেছেন, ভারত চায় বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও দু-দেশের জনগণের স্বার্থভিত্তিক সুসম্পর্ক। তিনি আরও লেখেন, আমি বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীল এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্রের সমর্থক। মোদি লেখেন, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর আলোচনায় সীমান্ত বিরোধ-সহ বেআইনি অনুপ্রবেশ ঠেকানোর বিষয়ে কথা বলেছি। সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশে হিন্দু-সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ভালো থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছি। মোদির এই ফেসবুক পোস্টগুলি বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ঠিক কোন ধরণের বৈঠক হয়েছে। আসলে হাসিনার প্রত্যবর্তন চাওয়া হলেও নরেন্দ্র মোদি যে তাতে কোনও গুরুত্ব দেয়নি সেটা বিদেশ সচিবের বক্তব্যেই পরিস্কার। অন্যদিকে, মোদি যে ফেসবুক স্টেটাস দিয়েছেন তাতে বোঝা যাচ্ছে তিনি হিন্দু নির্যাতন ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বাংলাদেশকে কার্যত চরম সতর্ক করে দিয়েছেন। দেশে প্রবল বিরোধিতা থাকা সত্বেও নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেছেন মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। আসলে তিনি বোঝাতে চাইলেন, ভারত এখনও সুযোগ দিতে তৈরি। বাকিটা বাংলাদেশ ও মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে। দেওয়াল লিখন কি পড়তে পারছেন নোবেলজয়ী?
Discussion about this post