বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ সেনার দ্বন্দ্ব অবশেষে প্রকাশ্যেই চলে এল। এতদিন যা ছিল পর্দার আড়ালে এবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান পর্দার আড়াল সরিয়ে নিলেন। সেই সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসকে বুঝিয়ে দিলেন তাঁর সরে যাওয়ার সময় আসন্ন। তাঁকে যেতেই হবে। কারণ মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে ডেডলাইন এঁকে দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন করাতে হবে, আর আগামী বছরের শুরুতেই বাংলাদেশ শাসন করবে একটি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত স্বাধীন সরকার। যারা দেশের সমস্ত নীতি নির্ধারণ করবে। বুধবার ঢাকা সেনানিবাসের দরবার হলে এক অভূতপূর্ব ভাষণ দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। সেখানে তিনি হাজারের বেশি সেনা আধিকারিকদের সামনে বুঝিয়ে দিলেন তিনিই সর্বাধিনায়ক। প্রসঙ্গত, সেনাপ্রধানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার একাধিক ষড়যন্ত্র করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সাগরেদরা। কিন্তু জেনারেল ওয়াকারের প্রতি অনুগত্যে দেখিয়ে সিংহভাগ আধিকারিক সেই প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র বানচাল করেছে বাংলাদেশ সেনা। তখনই দেওয়াল লিখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা পড়তে পারেননি উড়ে এসে জুড়ে বসা ইউনূস সাহেব।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রাক্তন শাসক দল বিএনপি সোমবারই ইউনূস সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পায়তারা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এবার বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সুরেই সুর মেলালেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। সেনা আধিকারিকদের সামনে তিনি বললেন, একটি নির্বাচিত সরকার সেনাবাহিনীর অভিভাবক হিসাবে কাজ করে। কিন্ত গত ন’মাস ধরে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী অভিভাবকহীন। এই কারণেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন করাতেই হবে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বার বার সংস্কারের দোহাই দিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি, জাতীয় পার্টির মতো বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসছিলো।
এবার বাংলাদেশের সেনাপ্রধান আরও এক কদম এগিয়ে ইউনুসের সরকারের সংস্কারের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন। তাঁর কথায়, দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার কেবলমাত্র একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেনাপ্রধানের এই মন্তব্য যথেষ্টই ‘তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইউনূস সরকার অনির্বাচিত এক অন্তর্বর্তীকালীন বন্দোবস্ত। প্রথম থেকেই ঠিক ছিল ৩-৪ মাসের মধ্যে নির্বাচন করাতে হবে। কিন্তু এই সরকার নয় মাস পেরিয়ে যাবার পরেও নির্বাচন করানো নিয়ে নানান টালবাহানা শুরু করে বাংলাদেশের তদারকি সরকার। প্রথমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির দাবিদাওয়ার আড়ালে সংস্কার কর্মসূচির দোহাই। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টির চাপে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার। সর্বশেষ উদাহরণ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা। যা মূলত জাতীয় নাগরিক পার্টির চাপেই করা হয়েছে। প্রসঙ্গত কয়েক মাস আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান একবার সতর্ক করেছিলেন ইউনূস সরকারকে। সেবার বলেছিলেন, এনাফ ইজ এনাফ। এবার শুধরে যান। কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত করেনি ইউনূসবাহিনী।
সেনাপ্রধানের এই সতর্কবার্তার পর উল্টে তাঁকেই সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র রচনা করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। এমনকি সেনাবাহিনীকে অজ্ঞাতে রেখে মিয়ানমারে রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মির জন্য মানবিক করিডর দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে অন্তরবর্তীকালীন সরকার। যা কোনও ভাবে মেনে নিতে পারেননি জেনারেল ওয়াকার। বুধবার ঢাকার সেনানিবাসে ‘সেনা দরবারে’ উপস্থিত সেনা অফিসারদের ওয়াকার-উজ-জামান আশ্বস্ত করেন, আগামী ১ জানুয়ারির মধ্যে একটি নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবেই। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে দেশে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করণীয় তাই করবে সেনাবাহিনী। তাঁর কথায়, “ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়”। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল মনে করছেন, জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের এই মন্তব্যই গভীর ইঙ্গিত বহন করছে। কেউ কেউ বলছেন, যদি মুহাম্মদ ইউনুস কোনও উল্টো সিধা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সেনাবাহিনী তাঁকেই সরিয়ে দিতে পারে। এটাই এখন দেওয়াল লিখন বাংলাদেশে।












Discussion about this post