দেশের এখন অরাজক অবস্থা। একদিকে সেনাবাহিনী ডিসেম্বরে নির্বাচন করানোর চূরান্ত নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপিও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করানো নিয়ে চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকার সচিবালয় উত্তাল এবং সরকারি কর্মচারিরা আন্দোলনে পথে নেমেছে। প্রাথমিক শিক্ষকরাও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে। দেশে আইন-শৃঙ্খলা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সেই আবহেই প্রধান উপদেষ্টা জাপান সফরে গিয়েছেন। কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যে এই অবস্থায় দেশকে ফেলে রেখে বিদেশ সফর করেন, সেটা ইতিহাসে বিরল। যা করলেন মুহাম্মদ ইউনূস। ফলে তাঁর জাপান সফর নিয়ে নানান জল্পনা শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুহাম্মদ ইউনূসকে বাধ্য হয়েই জাপান সফরে যেতে হয়েছে। কারণ এর পিছনে অন্য একটি রহস্য রয়েছে।
জিডিপির অনুপাতে পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে বেসরকারি বিনিয়োগ। বিনিয়োগ না বাড়ায় তৈরি হচ্ছে না কর্মসংস্থানও। সেই সঙ্গে বাড়ছে বেকারত্ব। এদিকে, ভালো নেই ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতিও। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশের শিল্পচিত্র একেবারেই খারাপ। এমন বহুমুখী চাপে নাস্তানাবুদ দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, ৬০ শতাংশের বেশি কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে না। ব্যাংকে সুদ বেড়েছে, গ্যাস নেই, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, সব মিলিয়ে শিল্প কলকারখানা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। সরকার গ্যাস-বিদ্যুৎ ঠিকমতো দিতে পারছে না। ফলে বিগত এক বছরে বাংলাদেশে বেকার বেড়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলেই দাবি করছেন অর্থনীতিবিদরা। মুহাম্মদ ইউনূস জাপান থেকে অনেকটা বেকার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলেন। বৃহস্পতিবার টোকিওতে ‘বাংলাদেশ সেমিনার অন হিউম্যান রিসোর্সেস’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জাপানে বাংলাদেশিদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রয়োজনীয় সব কিছু করবে। তাঁর দাবি, জাপানের ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকটের কারণে বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ শ্রমিক নেবে জাপান।
তবে প্রশ্ন উঠছে, শুধুমাত্র শ্রমিক সমস্যা সমাধান করতেই কি জাপানে গিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস? জানা যাচ্ছে, এর পিছনে রহস্য একেবারেই অন্য। গত বছর জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে যে সহিংস আন্দোলন হয়েছিল। সে সময় ঢাকা মেট্রোতে হামলা হয়েছিল। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল একাধিক মেট্রো স্টেশনে। গণ অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা স্বীকারও করেছিলেন মেট্রো রেলে হামলা পরিকল্পিত ছিল। জানা যাচ্ছে, এই ঘটনায় চরম ক্রুদ্ধ জাপান সরকার। কারণ, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মেট্রো রেল প্রকল্পে বিনিয়োগ ও নির্মান করেছে জাপান। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা সিংহভাগ অর্থায়ন করেছে ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পে। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সূত্রের খবর, জুন-জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় মেট্রো রেল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় ক্ষুব্ধ জাপান।
পাশাপাশি কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৫৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ‘প্রকল্প বিলাস’ বলে অভিহিত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
এই প্রকল্পেও অর্থায়ন করছে জাইকা। সূত্রের খবর, হাসিনা আমলে চালু হওয়া এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্কিত কথা ভালোভাবে নেয়নি জাপান। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে উচ্চাভিলাসী প্রকল্প বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু এটাকে বিলাসী প্রকল্প বলায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গিয়েছে। জানা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের আয়তন ছোট করে দিতেও উদ্যোগী হয়েছিলেন জ্বালানী উপদেষ্টা। সবমিলিয়ে জাপান বাংলাদেশে আর বিনিয়োগ করতে নারাজ। কূটনৈতিক স্তরে এই খবর ঢাকায় পৌঁছেও গিয়েছে। তাই তড়িঘড়ি ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে টোকিও ছুঁটেছেন মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সেখানে গিয়েও তিনি শুধুমাত্র শ্রমিক রফতানি করার ছাড়পত্র আদায় করে এলেন।












Discussion about this post