বিগত কয়েকদিনের বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে চোখ বোলালে একটা সংবাদে চোখ আটকে যেতে বাধ্য, সেটা হল ক্রমাগত সীমান্তে পুশ-ইন করছে ভারত। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুশ-ইনের খবর ছাপা হচ্ছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে। অর্থাৎ, এটাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাথাব্যাথার কারণ। আবার ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যমও এই খবর করছে, তবে সেখানে লেখা হচ্ছে অবৈধ বাংলাদেশিদের পুশ-ব্যাক করল বিএসএফ। আসলে, ভারতের দিকে যেটা “পুশ-ব্যাক”, বাংলাদেশের চোখে সেটাই “পুশ-ইন”। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাতে কেন এক তৎপর বিএসএফ?
পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলা এবং তারপর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ বা যুদ্ধ যাই বলা হোক না কেন সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকারের মনোভাব খুব স্পষ্ট। সেটা হল, দেশের মাটিতে আর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বরদাস্ত করবে না ভারত। মূলত পহেলগাঁও ঘটনার পরই ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নির্দেশিকা জারি করে সমস্ত রাজ্যগুলিকে জানায়, ভারতে থাকা সমস্ত বেআইনিভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের চিহ্নিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নির্দেশ পেয়েই ভারতের অনেক রাজ্যই তৎপর হয় অবৈধ পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করতে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ও গুজরাট সরকার। পাশাপাশি, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক থেকেও হাজার হাজার বাংলাদেশিকে ধরা হয়। এছাড়া অসম, ত্রিপুরাও প্রচুর অবৈধ বাংলাদেশিদের আটক করে। সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ মেনে রাজ্যগুলি অবৈধভাবে ভারতে এসে বসবাসকরা বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে এবং তালিকা তৈরি করে। যাদের মধ্যে অনেকেই ভারতে এসে অবৈধভাবে ভারতীয় পরিচয়পত্র জোগার করে ফেলেছিল। এদের মধ্যে অনেকের কাছেই ভোটার, আধার ও প্যান কার্ডের মতো ভারতীয় পরিচয় পত্র রয়েছে। কিন্তু ভারতের ডিজিটাল আধার ডেটাবেস থেকে সহজেই ধরা পড়ে যায় তাঁরা কবে কখন ও কোথা থেকে ভোটার বা আধার কার্ড জোগাড় করেছে। এবার ভারত সরকার সেই তালিকা ধরে ধাপে ধাপে সেই অবৈধ বাংলাদেশিদের সীমান্ত দিয়ে কার্যত জোর করেই বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে শুরু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিজিপির অভিযোগ, ভারত রাতের অন্ধকারে তাঁদের জোর করে পুশ-ব্যাক করছে। বিজিবি কর্তাদের দাবি, যদি তাঁরা বাংলাদেশি নাগরিক হন, তাহলে প্রমান দিক বিএসএফ, আমরা তাঁদের সানন্দে ফেরত নেব।
সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ প্রায় ৩ হাজারের বেশি অবৈধ বাংলাদেশিকে সে দেশে পুশ-ব্যাক করেছে। আর সেটা করা হচ্ছে সীমান্তের যে কোনও পয়েন্ট থেকে। অর্থাৎ, দু হাজার কিলোমিটারের বেশি পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে যেমন পাঠানো হচ্ছে, তেমনই অসম ও ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়েও পুশ-ব্যাক করছে বিএসএফ। বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নাগরিকদের অধিকাংশই গুজরাট, রাজস্থানে শ্রমিকের কাজ করতেন। আবার কেউ কেউ উত্তরপ্রদেশের পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। অনেকেই এমন আছেন যারা প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন। ভারতেই তাঁদের সন্তানের জন্ম এবং এখানেই তাঁরা পড়াশোনা করছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত ছয়-সাত মাস ধরে বাংলাদেশের একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা ভারতকে নাগাতার উস্কানি দিয়ে গিয়েছে। কখনও চার ঘণ্টায় কলকাতা দখল করে নেওয়ার হুমকি আবার কখনও অখণ্ড বাংলাদেশের মানচিত্র প্রকাশ করে। আবার সেভেন সিস্টার্স নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ক্রমাগত হুমকিও ভারত সরকার খুব ভালো ভাবে নেয়নি। এবার ভারত প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় এখন পুশ-ব্যাক ও পুশ-ইন নিয়ে টানটান উত্তেজনা। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কয়েকবার চেষ্টা করেছিল বিএসএফকে জবাব দেওয়ার। কিন্তু পারেনি, ফলে প্রতিটি পুশ-ব্যাকই তাঁরা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সূত্রের খবর, বাংলাদেশের তরফে সরকারিভাবে চিঠিও দেওয়া হয়েছে এই বিষয়ে। এমনকি বিজিবির তরফে বারবার ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের আহ্বানও এসেছে। কিন্তু ভারত অনড় ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে।












Discussion about this post