২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি খেলেছিলেন ভাঙা পা নিয়েই। আর তাতেই বাজিমাত করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৬-এর নির্বাচনে তাঁর সামনে পাহাড় প্রমান চাপ। একদিকে সরকারের সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অন্যদিকে দলীয় কোন্দলে জেরবার পরিস্থিতি। তার ওপর মেরুকরণের রাজনীতিতে অপারেশন সিঁদূর বঙ্গ বিজেপির অন্যতম হাতিয়ার। ফলে আসন্ন বিধানসভাতেই কি “দিদি আউট-দাদা ইন” হচ্ছে?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সাড়া জাগিয়েও ভরাডুবি হয়েছিল বঙ্গ বিজেপির। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত ভাঙা পা নিয়েই গোটা বাংলা চষে ফেলেছিলেন। নন্দীগ্রাম আসনের প্রেস্টিজ ফাইটে নিজে হেরে গেলেও দলকে দিয়েছিলেন অভূতপূর্ব সাফল্য। ২৯২ আসনের রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূল পেয়েছিল ২১৩টি আসন। আর বিজেপির ঝুলিতে ছিল মাত্র ৭৭ আসন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছিলেন, সেবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিতিয়েছিল তিন “ম”-এর যুগলবন্দি, সেই সঙ্গে ছিল মমতার “ম”। একটি “ম” মুসলিম ভোট, অন্যটি মহিলা ভোট আর তিন নম্বরটা হল মেরুকরণ। বিজেপি সেবার ধর্মীয় মেরুকরণের ভুল পথে হেঁটেছিল। বিজেপি নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রকাশ্যে বেগম বলা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। ফলে ভোট বাক্সে ধরাসায়ী হয়েছিল বিজেপি। কিন্তু এবার অনেকটা আগে থেকেই আঁট-ঘাঁট বেঁধে নেমেছে বঙ্গ বিজেপি। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজ্যে এসে পাঁচটি পয়েন্ট চিহ্নিত করে দিয়ে গিয়েছেন তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য। রাজ্যের তৃণমূল সরকার পাহাড় প্রমান দুর্নীতিতে আস্টেপিষ্টে বেঁধে গিয়েছে। একদিকে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীদের চাকরি গিয়েছে নিয়োগ দুর্নীতির জেরে। ২০২১ সালে জিতে শিক্ষামন্ত্রী হওয়া পার্থ চট্টোপাধ্যায়-সহ তৎকালীন গোটা শিক্ষা দফতরই জেলের হাওয়া খাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগেও শাস্তির খাঁড়া ঝুলছে আদালতে। অন্যদিকে আর জি কর মেডিকেল কলেজে এক মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের মামলাতেও শাসকদলের প্রত্যোক্ষ যোগ নিয়ে গোটা রাজ্য উত্তাল হয়ে উঠেছিল। সে সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিলেন লাগাতার রাত দখল ও প্রতিবাদ মিছিল সামলাতে। আর জি কর আন্দোলন স্থগিত হয়নি, মানুষের মন থেকে মুছেও যায়নি। আবার সাম্প্রতিক সময়ে মুর্শিদাবাদের ভয়াবহ দাঙ্গা পরিস্থিতি, হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, এলাকা ছাড়া হতে বাধ্য করাও তৃণমূলের বিপক্ষে যাবে। ফলে বিরোধী দল হিসেবে বিজেপির সামনে এখন অনেক অস্ত্র। সেখানে কয়েকটি জেলায় গোষ্ঠী কোন্দল সামলাতেই ব্যস্ত তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের হাতে আরেকটা বড় অস্ত্র তুলে দিলেন বীরভূমের জেল-খাটা নেতা অনুব্রত মণ্ডল। নিজের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে টেলিফোনে তুমুল গালিগালাজ করলেন বোলপুর থানার আইসি লিটন হালদারকেই। শুধু তাঁকে গালি দিয়েই ক্ষান্ত হননি অনুব্রত। তাঁর মা ও স্ত্রীকে নিয়েও অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলেছেন। আর সেই অডিও ক্লিপ সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফাঁস করেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার স্বয়ং।
২৬-এর নির্বাচনের আগে অনুব্রত মণ্ডলের কেস ধামাচাপা দিতে কালঘাম ছুঁটবে তৃণমূল কংগ্রেসের। এমনটাই মনে করছেন বঙ্গ রাজনীতির খোঁজখবর রাখা বিশ্লেষকরা। বীরভূমের কেষ্ট কেন অধরা? সেই প্রশ্ন তুলে শুভেন্দু অধিকারী বড় কর্মসূচি নিয়েছিল বীরভূমে। নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠছিল, কেন ক্ষমা চেয়ে ছাড় পাবেন অনুব্রত? পুলিশ কেন কড়া পদক্ষেপ নিতে দেরি করছে? এই আবহে প্রবল চাপে পড়ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। অবশেষে বোলপুরের আইসি লিটন হালদারকে ফোনে হুমকি দেওয়ার সাত দিন পর এসডিপিও অফিসে হাজিরা দিলেন অনুব্রত মণ্ডল। সূত্রের খবর, অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়ে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছিল তৃণমূলেরই অন্দরে। গত ক’দিনে বীরভূমের ‘প্রভাবশালী’ তৃণমূল নেতাদের একাংশের গতিবিধিতে ইঙ্গিতপূর্ণ কিছু পরিবর্তন এসেছে। দলের অন্দরেও যেমন শিবির বদলানোর তোড়জোড় চলছে, তেমনই তৃণমূল ছেড়ে পদ্ম-শিবিরে নাম লেখানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বুধবার বীরভূমের কঙ্কালীতলা পঞ্চায়েত এলাকার বনডাঙায় তৃণমূলের পার্টি অফিসে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। সেখানে হাজির ছিলেন জেলা রাজনীতিতে ঘোর অনুব্রত-বিরোধী বলে পরিচিত কাজল শেখ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, ওই বৈঠকে দেখা গিয়েছে অনুব্রত-অনুগামীদের একাংশকেও। যা বীরভূমের গত এক দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরল বলেই মনে করছেন অনেকে। বীরভূম জেলায় কেষ্টর ‘খাস লোক’ বলে পরিচিত স্থানীয় তৃণমূল নেতা তুষার মণ্ডল। এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। কারণ, যারা একসময় অনুব্রতর খাস লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরাই এখন অনুব্রত বিরোধী কাজল শেখের দরবারে হাজির হচ্ছেন। বীরভূমে তৃণমূলের অন্দরের এই দড়ি টানাটানির মধ্যে জেলায় নিজেদের শক্তি বাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। এ দিন যখন কঙ্কালীতলায় তৃণমূলের মধ্যে ‘শিবির বদল’ পর্ব চলছিল, তখনই বীরভূমের সাঁইথিয়া বিধানসভার কুনুরি-সহ লাগোয়া কিছু গ্রামের ১৫০ জন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। সবমিলিয়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক জমি ধীরে ধীরে আলগা হচ্ছে। এই ঘটনা শুধু বীরভূমেই নয়, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দুই ২৪ পরগণা-সহ আরও কয়েকটি জেলায় দেখা যাচ্ছে। ফলে ২০২৬-এর নির্বাচন শাসকদল তৃণমূলের কাছে যথেষ্টই টাফ হতে চলেছে।












Discussion about this post