গত বছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে যে সহিংস আন্দোলন হয়েছিল, তাতে সংগঠিত গণহত্যা চালিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এমনটাই দাবি ছিল আন্দোলনকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে চলে আসেন। ফলে পালাবদল হয় বাংলাদেশে। ক্ষমতায় আসে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ছাত্রনেতারাই। পিছনে পর্দার আড়ালে ছিল জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বভাবতই শেখ হাসিনাকে গণহ্ত্যা চালানো, গুম, অপরহণ, বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো নানা অপরাধে দোষী প্রমান করতে মামলা দায়ের করে। এই মামলার সংখ্যা আড়াইশোর বেশি বলেই জানা যায়। সেই সঙ্গে ঢাকার আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে শেখ হাসিনা এবং আরও কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী মামলাগুলি দায়ের হয়। যার বিচারপর্ব শুরু হয়েছে। কিন্তু হাসিনা পলাতক, তাই তাঁকে আদালতে হাজির করানো যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। আর সেই গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পুলিশের সদর দফতর ইন্টারপোলের কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আর্জি জানায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউর তাজুল ইসলাম দাবি করেছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের ফেরত আনতে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করবে। এটা ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনা। কিন্তু এরপর সাতমাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, হাসিনা-সহ সংশ্লিষ্ট কারও নামেই রেড নোটিশ জারি করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে তাদের রেড নোটিশের তালিকায় বর্তমানে ৬৪ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধ ও বিভিন্ন হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। এর আগে ২০১৫ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ঢাকায় গ্রেনেড হামলা মামলা-সহ বিভিন্ন মামলার তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রথমে ইন্টারপোল ওই বছরই জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছিল। কিন্তু তারেক রহমানের পাল্টা মামলার পর ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ ইন্টারপোলের ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রেড নোটিশের তালিকা থেকে তারেক রহমানের নাম প্রত্যাহারের আদেশ দেয় ইন্টারপোল কমিশন। ফলে এবারও হাসিনা এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনও নোটিশ জারি করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ইন্টারপোল ছাড়াও সরাসরি ভারত সরকারকে একধিক চিঠি দিয়েছিল শেখ হাসিনাকে প্রত্যার্পণ করার জন্য। কিন্তু ভারতের তরফে এর কোনও জবাবই দেওয়া হয়নি বলে জানা যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে, সেই চুক্তি মোতাবেক হাসিনাকে ফেরত চেয়েছিল ঢাকা। কিন্তু ভারত তাতে আমল দেয়নি। কারণ, ওই বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির কয়েকটি ধারায় ভারত বাংলাদেশের দাবি মানতে বাধ্য নয়। তাহলে কি হবে শেখ হাসিনার, তাঁকে কিভাবে ফেরত পাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দাবি করে আসছিলেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য হাসিনার বিচার করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু তাঁর বিচারপর্ব শুরু হলেও তাঁকে ফেরত পেতে কালঘাম ছুটছে সরকারের। এবার আদালতের নির্দেশে পলাতক হাসিনা-সহ প্রত্যেকের বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
এখানেও বড় সড় প্রশ্নচিহ্ন আছে। শেখ হাসিনা পলাতক বা নিরুদ্দেশ। ইন্টারপোলে এমন নিরুদ্দেশ ব্যক্তিদের জন্য ইয়োলে নোটিশ জারির ব্যবস্থা আছে। ফলে রেড নোটিশে কোনও সদুত্তর না মেলায় নিরুদ্দেশ হাসিনার জন্য ইয়োলে নোটিশ জারি করা যেতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হল, শেখ হাসিনা নিরুদ্দেশ নন, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় নিয়ম করেই হাজির হচ্ছেন। বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ ও নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি যে ভারতে আছে এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার-সহ গোটা পৃথিবীরই জানে। তাহলে বাংলাদেশ নাকি ভারত, আদালতের নির্দেশে কোন দেশের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবে সরকার? বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাসিনাকে নিয়ে নালিশও ঠুকে বসে আছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ খোলার জন্য। এটা তিনি নিজের মুখেই জানিয়েছেন। ফলে সবদিক থেকেই নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে বসে আছেন মুহাম্মদ ইউনূস। ফলে অনেকেই মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার দাবি করা ইউনূস ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গোরা আদতে লোক দেখানো নাটক করে চলেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রমান দেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্যই নেই।












Discussion about this post