গত বছরের জুলাই – অগাস্টে বাংলাদেশে কোনও যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, যা হয়েছিল সেটা ছিল রাজনৈতিক বিরোধ। শেখ হাসিনা সে সময় দেশ পরিচালনায় শীর্ষপদে ছিলেন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল-সহ উল্লেখযোগ্য উন্নয়নমূলক কাজ তিনি করেছেন। তাই সেই সব অবকাঠামো ধ্বংসের সঙ্গে তিনি জড়িত থাকতে পারেন না। এমনকি ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিনি কোনও হত্যার নির্দেশ দেননি। ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হয়ে সাওয়াল করার সময় এই ধরণের যুক্তিজাল বুনলেন তাঁর হলে লড়া রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী।
আদালতে তিনি এও দাবি করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। প্রসিকিউশন কোনও রূপ প্রমাণ দাখিলেও ব্যর্থ হয়েছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একতরফা মামলা দায়ের করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্ক সৃষ্টি হলে, শেখ হাসিনার পক্ষে একজন রাষ্ট্রকর্তৃক নিযুক্ত আইনজীবীকে নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক হয়। অবশেষে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনজীবী আমির হোসেনকে শেখ হাসিনার পক্ষে লড়ার জন্য নিয়োগ করে। তিনিই এবার আদালতে শেখ হাসিনার হয়ে সাওয়াল করলেন। এবং শুনানিতে আইনজীবী আমির হোসেন জোরালো সাওয়াল করে সরকার পক্ষকে চাপে ফেলে দিলেন বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
নানান যুক্তি তুলে ধরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ দুই আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করেছেন তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আমির হোসেন। কেন শেখ হাসিনাকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিৎ, সে প্রসঙ্গে হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন আদালতে দাবি করেন, ১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের বিচার হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসে বাংলাদেশে কোনও যুদ্ধই সংঘটিত হয়নি। যা হয়েছিল রাজনৈতিক বিবাদ। অতএব যুদ্ধাপরাধ থেকে উদ্ভুত যে সমস্ত অপরাধ মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেই ধরণের কোনও অপরাধ এখানে সংঘটিতই হয়নি।
আকাট্য যুক্তি, এখন দেখার, সরকার পক্ষের আইনজীবী এই সাওয়ালের পাল্টা কি যুক্তি দেন। যদিও এদিনও সরকার পক্ষের আইনজীবী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আরজি জানান ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে। এদিন সব পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারসহ তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ই জুলাই অভিযোগ গঠনের আদেশের দিন ঠিক করেছেন। যদিও শেখ হাসিনার এক অডিও বার্তায় শোনা গিয়েছে, তিনি দাবি করেছেন, একটার পর একটা মামলা দিয়েছে। আমাকে নোটিশ দিক, আমি হাজিরা দিতে যাবো। কিন্তু তাঁর দাবি, এটা বিচারের নামে প্রহসন চলছে।
এদিকে অন্য এক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের অবস্থান নিয়ে। গত বছর ৫ আগস্ট তিনি দাবি করেছিলেন, জনতার ওপর সেনা গুলি চালাতে চায় না। আদৌ কি তিনি সত্যি বলেছিলেন, নাকি পুরোপুরি মিথ্যা কথা বলেছিলেন জেনারেল ওয়াকার। যত সময় যাচ্ছে, নতুন নতুন দাবি, নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। জানা যাচ্ছে, গত বছর ৫ আগস্ট গণভবনের নিরাপত্তার জন্য বিমান বাহিনীর প্রধান তাঁর বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মাঝপথেই নাকি থামিয়ে দেওয়া হয়। যদিও কে বা কারা তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিল সেটা পরিস্কার নয়। তবে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর বাসভবন রক্ষায় নিজের দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে যাচ্ছিন বিমানবাহিনীর প্রধান, তাকে কেনো বাধ্য করা হল সরে আসার জন্য?
জানা যাচ্ছে, তিনিই শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেই তাঁর জুনিয়র অফিসার দিয়ে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে সড়িয়ে নেন। এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে পরামর্শ করে হাসিনাকে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এতদিন মনে করা হতো, এই কাজটি করেছিলেন জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। দাবি, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জানতেনও না যে শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করেছেন, এবং সেনা বিমানে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হযে গিয়েছেন। কারণ তিনি তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতা, রাজনৈতিক দল জামাত-বিএনপি ও কিছু জঙ্গি নেতাদের সাথে বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। ধীরে ধীরে সব প্রকাশ পাবে বলে দাবি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের।












Discussion about this post