ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠের বলে দাবি করা একটি অডিও ক্লিপ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত ৯ জুলাই “এক্স-বাংলাদেশ লিডার অথরাইজড ডেডলি ক্রাকডাউন, লিকড অডিও সাজেস্ট” শিরোনামে প্রকাশিত ওই সংবাদে মাত্র ১৮ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপকে সামনে রেখে বিবিসি দাবি করে, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের সময় কঠোর দমন-পীড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অর্থাৎ, গণঅভ্যুত্থান দমানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানোর অনুমোদন যে শেখ হাসিনাই দিয়েছিলেন, ফাঁস হওয়া সেই অডিও টেপ যাচাই করে সত্যতা পেয়েছে বিবিসি আই। যদিও বিবিসির ওই প্রতিবেদন যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং ষড়ষন্ত্রের অংশ বলেই দাবি করছে আওয়ামী লীগ। তাঁরা তাঁদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এমনটাই দাবি করেছে। অপরদিকে. অভিযুক্ত শেখ হাসিনার ছেলে, সজীব ওয়াজেদ জয় এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, বিবিসির ওই প্রতিবেদন ‘অনৈতিক সাংবাদিকতার একটি নির্লজ্জ উদাহরণ’। আওয়ামী লীগের দাবি, এই অডিও ক্লিপের অংশটি ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজেন বোমা বিস্ফেরণের পরবর্তী সময়ের হতে পারে। এটা মোটেই ২০২৪ সালের নয়। তবে ইতিমধ্যেই বিবিসির ওই প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এমনকি কেউ কেউ বিবিসি-র প্রতিবেদনকে মানহীন সাংবাদিকতা বলেও আখ্যা দিতে ছাড়ছেন না।
বিবিসি তাদের প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ব্রিটিশ অডিও বিশ্লেষণ সংস্থা ‘ইয়ারশট’ থেকে যাচাই করানোর দাবি করছে। ইয়ারশটের দাবি, অডিও ক্লিপটি প্রযুক্তিগতভাবে “সম্পাদিত বা বিকৃত” নয়। যদিও বিবিসির এই বিশ্লেষণও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। প্রশ্ন উঠছে, ওই অডিওর উৎপত্তিকাল নির্ধারণে ফরেনসিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। অথচ বিবিসি এই বিষয়ে কোনও প্রযুক্তিগত তারিখ নির্ধারণ করেনি, যা সাংবাদিকতার তথ্য যাচাই নীতির পরিপন্থী। আবার শেখ হাসিনা কাকে, কোন পরিস্থিতিতে নির্দেশ দিচ্ছেন, বা কাদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিচ্ছেন, সেটাও উল্লেখ নেই। মাত্র ১৮ সেকেন্ডের ওই অডিওয় শেখ হাসিনাকে শুধুমাত্র মারাত্মক মারনাস্ত্র প্রয়োগের নির্দেশ দিতে শোনা গিয়েছে। এই কারণেই বিবিসির এই প্রতিবেদনটিকে অনেকেই উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দাবি করছেন। আওয়ামী লীগের তরফে কেউ কেউ দাবি করছেন, ফাঁস হওয়া এই অডিও আসলে ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান হামলার সময়কার। সে বার ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে এমনই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পাশাপাশি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি “ডেডলি ক্রাকডাউন” বা “প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন”-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে একটি বিস্ফোরক শিরোনাম দিয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে শিরোনামের এই অসামঞ্জস্য পাঠকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলেও অনেকে দাবি করছেন। মজার বিষয় হল, এই অডিও ক্লিপটি প্রথমবার জনসমক্ষে আসে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। কিন্তু তখন কোনও গণমাধ্যমেই তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এখন যখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে চার্জ গঠন করা হবে, ঠিক তার আগেই এই বিস্ফোরক প্রতিবেদন সামনে এল। আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক বছর পূর্তির আগ মুহূর্তে এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম বিবিসি কেন একটি পুরোনো ও অপ্রমাণিত অডিওকে নতুন করে ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ হিসেবে প্রকাশ করল সেটা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ডিপ স্টেটের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বাংলাদেশে যে চক্রান্তের শুরু হয়েছিল, তা এখনও বিদ্যমান। বিবিসি কি তাঁদের দ্বারাই প্রভাবিত হল? আবার বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিশেষ উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যানের মন্তব্য রয়েছে। ফলে অডিও ক্লিপের সূত্র নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই বলেই মনে করছেন অনেকে। সবমিলিয়ে বিগত এক বছরে চরম ব্যর্থ হওয়া ইউনূসবাহিনী নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই শেখ হাসিনাকে যে কোনও মূল্যে ফাঁসাতে মরিয়া। বিবিসির প্রতিবেদন ও রাজসাক্ষীর আগমণ এটাই প্রমান করে।












Discussion about this post