শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “রাজসাক্ষী” হতে রাজি বাংলাদেশের প্রাক্তন পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। অনেকেই মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে এটা মুহাম্মদ ইউনূসের একটা মাস্টারস্ট্রোক। কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটা প্রশ্ন উঠছে, ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনাকে কী আদৌ ফেরত পাবে বাংলাদেশ? এর উত্তর খোঁজার আগে একবার জেনে নেওয়া যাক, রাজসাক্ষী আদতে কি?
রাজসাক্ষী হলেন সেই মামলার একজন অভিযুক্ত, যিনি নিজের দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সেই অপরাধ প্রমান করার জন্য সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন। তাঁর স্বীকারোক্তি ও বয়নের ওপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকারি আইনজীবী মামলাটি ফয়সলা করার আবেদন করেন। ওই অভিযুক্ত অবশ্যই প্রত্যক্ষদর্শী হতে হবে, বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, যিনি রাজসাক্ষী হন, তাঁর শাস্তি তুলনামূলক কম হয়, বা মুক্তি পান। আইনজীবীদের দাবি, আইনের শাসন থাকলে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলবত থাকলে তদন্তের গতিপথ ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে এর কোনওটাই নেই। উল্টে একটা ভয় ও ভীতির পরিবেশ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে থাকা মামলায় একমাত্র অভিযুক্ত যিনি গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁকে রাজসাক্ষী করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।
ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনা ও দুই অভিযুক্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিচার শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, ওই ট্রাইবুনালের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার নিকট আত্মীয় হলেন বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজি। ফলে তাঁকে রাজসাক্ষী হয়ে নিজেকে বাঁচানোর উপায় বাতলে দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। এমনও জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিবার তাঁকে রক্ষা করার জন্য নানা মহলে যোগাযোগ করছিলেন। একটি অংশ এও দাবি করছেন, প্রাক্তন পুলিশ প্রধানকে কারাগারে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচারও করা হচ্ছিল। তাঁকে প্রবল চাপ দেওয়া হচ্ছিল, হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। অবশেষে তাঁকে রাজি করানো গিয়েছে রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য। এও জানা যাচ্ছে প্রাক্তন পুলিশকর্তার স্ত্রী কারাগারে গিয়ে তাঁকে বুখিয়েছেন এবং তাঁকে কম সাজা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফাঁসানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা। এটা তারই অঙ্গ।
মজার বিষয় হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ অনেক আগেই দাবি করেছিলেন এই মামলায় তৃতীয় অভিযুক্ত অর্থাৎ সাবেক আইজিপি রাজসাক্ষী হবেন। আর হলও তাই। সেই অংশের দাবি, বাংলাদেশের শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কমবেশি ৪৫০ মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা যায়। যার মধ্যে সিংহভাগ খুন, গণহত্যা বা ওই ধরণের মারাত্মক অভিযোগ। অর্থাৎ তিনি সারা দেশ ঘুরে ঘুরে খুন বা হত্যা করেছেন, বা নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতগুলি মামলা ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকারকে একজন রাজসাক্ষীর প্রয়োজন হল শেখ হাসিনাকে সাজা দেওয়ার জন্য। এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়।এবার সেই রাজসাক্ষী আদালতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যা যা অভিযোগ তুলবে, সবগুলিতেই হ্যাঁ-হ্যাঁ বলে সম্মতি দিয়ে যাবেন।
ফলে শেখ হাসিনাকে দোষী প্রমান করতে সুবিধা হবে অন্তরবর্তীকালীন সরকারের। মজার বিষয়, এর জন্য দলিলিক প্রমান বা ফরেন্সিক প্রমানের ধার ধরবে না সরকার পক্ষ। ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, সরকার পক্ষের আইনজীবীরা তদন্তকারী দলের তদন্তেই আস্থা রাখতে পারছেন না। অর্থাৎ জোরালো কোনও প্রমান তাঁদের হাতে নেই। সেই কারণেই রাজসাক্ষীর প্রয়োজন পড়ল। কারণ, ট্রাইবুনালে হাসিনার বিরুদ্ধে এটাই প্রথম গুরুতর কোনও মামলা। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারলে পরবর্তী মামলাগুলিতেও সুবিধা হবে হাসিনার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমান করতে। এতে ট্রাইবুনালে সরকারপক্ষের মুখ রক্ষাও হবে, আবার হাসিনাকেও বিপদে ফেলা যাবে।












Discussion about this post