বিহারের ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন করে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬২ লক্ষ ভোটারের নাম। যা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। এই আবহেও জানা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গেও এই কাজ শুরু হতে পারে আগামী মাসে। রাজনৈতিক মহলের অভিমত, এই বঙ্গে অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিলেই খেলা ঘুরে যাবে। চিন্তিত শাসকদল ইতিমধ্যেই সুর চড়াতে শুরু করেছে।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে তোলপাড় গোটা বিহার। ভোটার তালিকা থেকে ৫২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল। যা নিয়ে তপ্ত জাতীয় রাজনীতি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের কথাতেই বিহারে ভোটার তালিকা পরিমার্জন করছে নির্বাচন কমিশন। আসলে লক্ষ্য হল ভোট চুরি। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা ‘বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা’ নিয়ে এবার উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করল বঙ্গ রাজনীতিতেও। জানা যাচ্ছে, আসন্ন আগস্ট মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকাতেও ‘বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা’ শুরু করতে পারে নির্বাচন কমিশন। তার আগে একটি বিশেষ চিঠি এসে পৌঁছেছে নবান্নে। সেটা নিয়েও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। জানা যাচ্ছে, সেই চিঠিতে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরকে স্বতন্ত্র করতে বার্তা দেওয়া হয়েছে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে।
যদিও রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে ভোটার তালিকায় সংশোধনের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসাবেই এই পদক্ষেপ করতে চাইছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ঘটনা হল, বর্তমান ব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের অধীনে রয়েছে। যা মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেন। পাশাপাশি অর্থ দফতরের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হয় সিইও দফতরকে। এই আবহে সিইও দফতরের কাজের ক্ষেত্রে যাতে রাজ্য সরকারের নির্ভরশীলতা না থাকে, সেজন্য একাধিক পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সিইও দফতরে চারটি শীর্ষ পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়াও অনেক পদে শূন্যপদ রয়ে গিয়েছে। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শূন্যপদগুলি পূরণের বার্তা দেওয়া হয়েছে নবান্নকে পাঠানো চিঠিতে। পাশাপাশি অর্থ দফতরের জন্য অপেক্ষায় না রেখে সিইও দফতরের জন্য আলাদা বাজেট ঘোষণা করতে হবে বলে উল্লেখ করা রয়েছে কমিশনের সেই চিঠিতে। এছাড়া সিইও-কে সাহায্যের জন্য একজন আর্থিক উপদেষ্টা নিয়োগের কথাও বলেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য সিইও দফতরকে যেমন ঢেলে সাজাতে চাইছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। তেমনই এটিকে রাজ্যের হাত থেকে সরিয়ে স্বতন্ত্র করতে চাইছে তাঁরা।
কিন্তু এতেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। গত একুশে জুলাই মঞ্চ থেকে যেভাবে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিকে নিশানা করলেন। তাঁর প্রশ্ন, বলছে বাংলায় পরিবর্তন হলেই নাকি আসল উন্নয়ন হবে৷ আপনি তো দিল্লিতে ১১ বছর ক্ষমতায় আছেন, কী উন্নয়ন করেছেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘২০২৬ এর পর আমি দেখবো তোমরা কোথায় থাকো? বাংলায় পরিবর্তন করতে গিয়ে আবার দিল্লিতেই পরিবর্তন হয়ে যাবে না তো? আজকে তারই ভিত গড়া হল৷ এবার দিল্লিতে হবে পরিবর্তন৷’
পাশাপাশি তিনি একুশের মঞ্চ থেকে নির্বাচন কমিশনের অভিসন্ধি নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, বাংলাতেও যদি ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হয়, তাহলে তাঁরা তা হতে দেবে না। ঘেরাও করবেন।
২১শে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে একই সুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ, ‘২০২১-এর আগে বলেছিলাম খেলা হবে, এ বার বলছি পদ্মফুল উপড়ে ফেলা হবে’। বিজেপিকে খোঁচা দিয়ে অভিষেক আরও বলেন, ‘বিজেপির কাছে ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, নির্বাচন কমিশন, পেগ্যাসাস, সবই আছে। তার পরেও বাংলায় বিজেপি জিততে পারেনি।
বাইট – অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল সাংসদ
শাসকদলের এই রণংদেহী মূর্তি দেখে হাসছেন বিজেপি নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, আসলে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলে বিপদে পড়বে তৃণমূল। তাই তাঁদের গাত্রদাহ হচ্ছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যেমন দাবি তুললেন, তৃণমূল কংগ্রেসের রেজিস্ট্রেশনই বাতিল করা উচিৎ।
বঙ্গ বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, বিজেপির দাবি রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা ও অবৈধ বাংলাদেশীদের নাম বাদ দেওয়া। তাহলেই দেখা আসল লড়াই।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, দেশের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত এবং অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি যখন অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে তৎপর, তখন একমাত্র পশ্চিমবঙ্গ বিরোধিতা করছে। এর অর্থ তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে না যাতে ভোটার তালিকা সংশোধন না হয়। আসলে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটা বিশাল অংশ তৃণমূলকে ভোট দেয়। নির্বাচন কমিশন যদি নিবিড়ভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে গিয়ে বিহারের মতো বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দিয়ে দেয়, তাহলেই ছাব্বিশের নির্বাচনে চাপে পড়ে যাবে তৃণমূল। এই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুর চড়াতে শুরু করেছেন।












Discussion about this post