ভিনরাজ্যে বাংলা ভাষী মানুষদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। এই অভিযোগে সুর চড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই রাজ্যে এসআইআর হতে দেবেন না বলে নির্বাচন কমিশনকেও হুশিয়ারি দিয়েছেন। সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে তিনি কি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিলেন?
পশ্চিমবঙ্গে কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে? এই ধরণের জল্পনা বেশ কয়েক মাস ধরেই চলছে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করবো বললেই তো আর করা যায় না। এর জন্য প্রকৃত কারণ থাকতে হবে। যে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়, সেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হতে হয় না হলে দেশের সাংবিধানিক কাঠামো নষ্ট হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কি হয়েছে? সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা নতুন করে রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
শুরুটা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের একটি নির্দেশিকা ঘিরে। অপারেশন সিঁদুরের পর ভারতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করার জন্য সমস্ত রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। দেশের বিভিন্ন রাজ্য সেই নির্দেশিকা মেনে কাজ শুরু করলেও বিরোধিতা করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এবার অন্যান্য রাজ্যে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের ধরতে গিয়ে এই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের পাকড়াও করছিল পুলিশ। এটা নিয়েই শুরু হয় হইচই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুর চড়িয়ে দাবি করেন, বাংলাভাষীদের ধরে ধরে হেনস্থা করা হচ্ছে। তাঁর আরও অভিযোগ, বেছে বেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি বাংলার শ্রমিকদের হেনস্থা করছে। এটা নিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। বিজেপির দাবি, তামিলনাড়ু, কেরলের মতো অবিজেপি রাজ্যেও এই অভিযান চলছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী রাজনীতি করছেন। এমনকি তিনি ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়ে পথে নেমে পড়েছেন। অভিযোগ, বাংলাদেশের মানুষদের ভাষাও বাংলা, তাই যে বাংলাদেশি আর কে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ভাষা শুনে, আচার আচরণে বোঝা মুশকিল। তাই ভিন রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের সমস্যা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, বৈধ কাগজপত্র বিহীন সন্দেহজনক ব্যক্তিদের খোঁজ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাহায্য চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। একই দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে এই আচরণ কাম্য নয়।
অন্যদিকে বিহারে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনি নিয়ে কাজ চলছে। এখনও পর্যন্ত ৬৫ লক্ষের বেশি ভোঁতারের নাম বাদ গিয়েছে। কানাঘুশো এবার ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনি বা এসআইআর পশ্চিমবঙ্গে হবে। যা নিয়ে যারপরনাই ক্ষুব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি যেমন স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, এই রাজ্যে এসআইআর হতে দেব না।
ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। মনে করা হচ্ছে এটা এসআরআই শুরু করার প্রথম ধাপ। বিএলও-রা হলেন মূলত রাজ্য সরকারি কর্মচারী। সোমবার বীরভূমের এক প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত এই বিএলও-দের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, আপনারা রাজ্য সরকারি কর্মচারী। ভোট ঘোষণা হলে তখনই নির্বাচন কমিশনের আওতায় থাকবেন, তারপরে আবার রাজ্যের। তিনি বিএলও-দের উদ্দেশ্যে বলেন, একজনের নামও যেন তালিকা থেকে বাদ না যায় এটা খেয়াল রাখবেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন প্রশাসনিক প্রধান। তিনি কিভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে একের পর এক হুশিয়ারি দিতে পারেন? কিভাবেই বা তিনি রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের হুমকি দিয়ে নির্বাচনী কাজে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারেন? প্রশ্ন বিরোধী দলের।
দিল্লির অলিন্দে গুঞ্জন, জল এবার মাথার উপর দিয়ে বইছে। একজন মুখ্যমন্ত্রী হয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে অস্বীকার করছেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা মানছেন না। কখনও সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অসহযোগিতা করছেন। কখনও এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট বা সিবিআই আধিকারিকদের কাজে বাঁধা দিচ্ছেন, তা দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী। ফলে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতেই পারে। অন্যদিকে বঙ্গ বিজেপির নেতারা ছাড়াও আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সহ আরও কয়েকটি সহযোগী সংগঠন কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলেও খবর। তাই দিল্লির রাজনীতিতে জোর গুঞ্জন, খুব শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বড় কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। সেটা রাষ্ট্রপতি শাসন হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।












Discussion about this post