বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হল। এই এক বছরে কি পেল বাংলাদেশ? যে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়েছিল এক বছর আগে, সেই বৈষম্য কি মিটেছে? আজকের দিনে দাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা কী? এই প্রতিবেদনে আমরা সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করি।
গণঅভ্যুত্থানের এক বছর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট। কতটা বদলে গেল বাংলাদেশ? গত বছর জুলাই মাস থেকে সামান্য কোটা বিরোধী আন্দোলন যখন “দাবি এক, দফা এক” আন্দোলনে পরিবর্তিত হয় তখনই বোঝা গিয়েছিল কিছু একটা ঘোটালা চলছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পারিবারিক কোটা তুলে দেওয়া নিয়েই শুরু হয়েছিল আন্দোলন, তৎকালীন শাসকদল আওয়ামী লীগ ও তার সর্বোচ্চ নেত্রী তথা বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই কোটা তুলে দিতেও রাজি ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দেয়। আন্দোলনকারীরা তবুও অনড় ছিলেন। অদ্ভুত উপায়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন হাসিনা হটাও আন্দোলনে পর্যবসিত হয়, শেষ পর্যন্ত তা গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হল। এর পিছনে দেশি-বিদেশি বৃহৎ শক্তির একটা হাত ছিল আজ তা, ওপেন সিক্রেট। এক বছর পূর্ণ করে বৈষম্য কি দূর হল বাংলাদেশে? এই প্রশ্নটাই খুঁজছে বর্তমান বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।
মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তিনি কি চাইলেই নিজের ইচ্ছামত সরকার পরিচালনা করতে পারছেন? বৈষম্যের শুরু এখান থেকেই। কারণ তিনি পারছেন না। আরও বৈষম্য আছে। কোটা ব্যবস্থা কি পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে বাংলাদেশে? না সেটা হয়নি, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বন্ধ হলেও জুলাই যোদ্ধা কোটা নতুন করে চালু হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ কোটা রয়ে গিয়েছে। এই কোটার প্রবর্তক বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা বর্তমান সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি নামে এক সদ্য গজিয়ে ওঠা এক রাজনৈতিক দল। আরও উদাহরণ আছে! এই দলের একেক জন নেতার ব্যাঙ্ক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার একটা প্রয়াস রয়েছে বাংলাদেশে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যারা নিজেরাই অনির্বাচিত তারা একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক দলকে দূরে ঠেলে দিতে সচেষ্ট। এটাও বৈষম্য! অর্থাৎ এগুলো তো রাজনৈতিক বৈষম্য।
আরও অনেক বৈষম্য আছে। যেমন সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের প্রতি বৈষম্য। বিগত এক বছরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। যদিও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও তাঁদের প্রেস উইং অস্বীকার করবে। একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে একটি অনির্বাচিত সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনার বিরূপ মনোভাবের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল আওয়ামী লীগকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার উদাহরণ গোটা বিশ্বে খুব কম। যা বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার করে দেখিয়েছে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।
এখানেই শেষ নয়, নির্দিষ্ট কোনও একটি রাজনৈতিক দল তথা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জামিন খারিজ হচ্ছে। আবার সংখ্যালঘু নেতা তথা বাংলাদেশে হিন্দুদের অন্যতম মুখ চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর জামিনো বারেবারে খারিজ হচ্ছে! এটাও খুব বিরল ঘটনা। এটাও এক ধরণের বৈষম্য। বর্তমান মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের আমলে এগুলোই সবচেয়ে বেশি করে হচ্ছে বিগত এক বছরে। রাজনৈতিক দলের প্রতি বৈষম্য, সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য দেশের ছাত্র সমাজের প্রতি বৈষম্য। সবটাই চলছে বাংলাদেশে।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন থেকে যার শুরু, সেই বাংলাদেশ কিভাবে বদলে গেল বিগত এক বছরে? এই ছাত্র নেতাদের কেউ কেউ বিগত এক বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বাড়িয়েছেন। কেউ আবার এতটাই ক্ষমতাশালী যে তাঁর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেমন সারজিস আলম বা হাসনাত আব্দুল্লাহ বা নাহিদ ইসলাম। আবার বাংলাদেশের অন্যতম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বা মাহফুজ আলম। তাঁদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি এখন বিপুল। তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। তাদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সও ফুলে ফেঁপে উঠেছ। কোন উপায় হল এটা? উত্তর খুঁজে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সে দেশের রাজনৈতিক মহল। আওয়ামী লীগ কেন বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বাদ যাচ্ছে? এটাও একটা বৈষম্য। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের এক বছর পূর্তি হওয়ার পর, যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ তা কী হওয়ার ছিল? এই প্রশ্নও উঠছে। আজ গণঅভ্যুত্থান বা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক বছর পর কতটা ভালো আছে বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তরে একটাই জবাব আসে, সেটা হল ভালো নেই বাংলাদেশ। বৈষম্য তো দূর হয়ইনি, উল্টে আরও বেড়েছে।












Discussion about this post