২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন আসন্নপ্রায়। উৎসবের মরসুমেও তাই রাজনৈতিক উত্তাপ কমছে না পশ্চিমবঙ্গে। এই অবহেই এক চঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। বিধানসভায় টানা চতুর্থ জয় হাসিল করতে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবারে শতাধিক আসনে প্রার্থী বদল করতে পারে। বিজেপি হাওয়ায় তৃণমূলের তুরূপের তাস নতুন প্রার্থীরাই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসআইআর আতঙ্কে ভোটের অন্য অঙ্ক কষতে চাইছে শাসকদল তৃণমূল। দেখে নেওয়া যাক কাদের নাম বাদের তালিকায় রয়েছে।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। শাসকদল তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপি নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে। জানা যাচ্ছে দলীয় প্রার্থী তালিকা তৈরি করতে ঘন ঘন বৈঠক চলছে। সেই সঙ্গে চলছে সাংগঠনিক রদবদলের কাজ। এর মধ্যেই সামনে আসছে কিছু তথ্য। যা নিয়ে চলছে জোর চর্চা।
জানা যাচ্ছে, তৃণমূলের ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাক সম্প্রতি একটি খসড়া প্রার্থী তালিকা জমা দিয়েছে দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। অনুরূপ একটি তালিকা জমা পড়েছে ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরেও। সূত্রের খবর, এই তালিকায় প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে দুই থেকে তিনজন প্রার্থীর নাম রয়েছে। এলাকায় এলাকায় সমীক্ষা করে আইপ্যাক প্রতিটি বিধায়কের রিপোর্ট কার্ড তৈরি করেছে। তাঁরাই সুপারিশ করেছে যে ৫০টির বেশি বিধানসভা কেন্দ্রে এবার নতুন প্রার্থী দিতে। অর্থাৎ এবার পঞ্চাশের বেশি আসনে তৃণমূল বিধায়করা টিকিট পাচ্ছেন না। অন্যদিকে এও জানা গিয়েছে, একশোটির কাছাকাছি আসনে এবার তৃণমূলের প্রার্থী হতে পারেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, বিজেপির হিন্দুত্বের প্রচারকে পাল্টা দিতেই এই সিদ্ধান্ত।
তৃণমূলের কোন কোন বিধায়ক এবার টিকিট পাবেন না সেটা অবশ্য ঠিক করবেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতামত গুরুত্ব পেতে চলেছে বলে জানা যাচ্ছে। তিনি চান যুব সম্প্রদায়ের থেকে জনপ্রিয় মুখ বেঁধে নিতে।
১৫ই অক্টোবরের পর যেকোনো সময় এই রাজ্যে শুরু হবে ভোটার তালিকার নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন বঙ্গে এসআইআর হলে ৬০ থেকে ৮০ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। যা নিয়ে প্রবল চিন্তায় শাসক শিবির। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে ফারাক ছিল সামান্যই। তৃণমূল পেয়েছিল ২ কোটি ৭৫ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৬১ ভোট। সেখানে বিজেপি পেয়েছিল ২ কোটি ৩৩ লক্ষ ২৭ হাজার ৩৪৯ ভোট। ফারাক মোটে ৪৩ লক্ষের কাছাকাছি। এবার যদি ভোটার তালিকা থেকে ৫০ লক্ষ ভুয়ো ভোটারের নাম বাদ যায়, তাহলেই চাপে পড়ে যাবে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি এই রাজ্যেও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই প্রার্থী তালিকা নিয়ে যথেষ্টই গবেষণা করতে হচ্ছে তৃণমূলকে।
আপাতত যা জানা যাচ্ছে সেটা হল, বেশ কয়েকজন তারকা বিধায়ক এবার টিকিট পাচ্ছেন না। যেমন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে যেখানে সেই রামপুরহাটে এবার নতুন প্রার্থী আসতে পারে। বর্তমান বিধায়ক আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় টিকিট পাচ্ছেন না, তিনি বর্তমানে ডেপুটি অধ্যক্ষের ভূমিকায় রয়েছেন। পাশের কেন্দ্র বোলপুর, সেখানে বর্তমান বিধায়ক চন্দ্রনাথ সিনহা রাজ্যের মন্ত্রী। সম্প্রতি ইডির নজরে তিনি রয়েছেন। কোনও রকমে গ্রেফতারি আটকানো চন্দ্রনাথকেও টিকিট দিতে নিষেধ করছে আইপ্যাক। পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার বিধায়ক প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরের নামও আইপ্যাকের তালিকায় রয়েছে। তিনিও সম্প্রতি কয়েকটি কারণে বিতর্কে জড়িয়ে তৃণমূলের বদনাম করেছেন। তাই এবার তাঁর টিকিটও কাটা পড়ে যেতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির বিধায়ক পার্থ প্রতীম দাসের নামও রয়েছে এই তালিকায়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাকি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দিকে ঝুঁকেছেন। জানা যাচ্ছে, নন্দীগ্রামের শহীদ জননী ফিরোজা বিবিকেও এবার টিকিট দেওয়া হবে না। তিনি পাঁশকুড়া কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক। একইভাবে তালিকায় নাম রয়েছে তমলুকের তৃণমূল বিধায়ক সৌমেন মাহাপাত্রর। যাকে এবার টিকিট নাও দেওয়া হতে পারে।
বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁর প্রাক্তন স্ত্রী সুজাতা মণ্ডল খাঁ এবার তৃণমূলের টিকিট নাও পেতে পারেন। বলাগড়ের মনোরঞ্জন ব্যাপারী, যিনি মাঝেমধ্যেই তৃণমূলের দুর্নীতি নিয়ে সরব হন, তাঁকেও এবার ছেঁটে ফেলা হচ্ছে বলেই খবর। হুগলির উত্তরপাড়ার তারকা বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিককেও এবার বাতিলের খাতায় রাখা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে এমনিতেই তৃণমূলের অন্দরে অসোন্তোষ রয়েছে। তাই তাঁকে এবার টিকিট দেওয়া হবে না। তৃণমূলের আরেক তারকা বিধায়ক প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তেওয়ারি জিতেছিলেন হাওড়ার শিবপুর থেকে। তিনি নাকি এবার নিজেই সরে যেতে চাইছেন। বারসতের চিরঞ্জীত চক্রবর্তীও এবার টিকিট পাচ্ছেন না। জানা যাচ্ছে এই আসনে টিকিট পেতে পারেন সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদারের ছেলে ড. বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার। বারসতের তারকা বিধায়ক চিরঞ্জীত চক্রবর্তী বেশ কয়েকদিন ধরেই বেসুরো। তেমনই কামারহাটির মদন মিত্রও এবার টিকিট পাচ্ছেন না বলে খবর। তাঁকে ঘিরেও নানা অসোন্তেষ দানা বেঁধেছে তৃণমূলের অন্দরে। অন্যদিকে কৃষ্ণনগর উত্তরে অভিনেত্রী কৌশানী মুখোপাধ্যায়কেও এবার টিকিট দিচ্ছে না তৃণমূল। তাঁর জায়গায় কোনও রাজনীতিবিদকে আনা হবে। একইভাবে বঁড়েজ্ঞার বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহাকেও এবার ছেঁটে ফেলছে তৃণমূল। তিনি এই মুহূর্তে ইডি হেফাজতে রয়েছেন, শিক্ষকনিয়োগ দুর্নীতি মামলায়। মামলার ইংলিশবাজারের কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীও এবার টিকিট পাচ্ছেন না বলেই খবর। তিনি নাকি ইদানিং কংগ্রেস ঘণিষ্ট হয়েছেন। এই একই অভিযোগে টিকিট হারাতে পারেন ইসলামপুরের তৃণমূল বিধায়ক আব্দুল করিম চৌধুরীও। আরও একটি বিষয় রয়েছে, সেটা হল, গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৪২ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাকে টিকিট দিয়েছিল। এবার শোনা যাচ্ছে সেই সংখ্যা ১০০-র কাছাকাছি হতে পারে।












Discussion about this post