বিগত কয়েকদিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা উত্তাল হাওয়া বইছে। এতে শীতের শুরুতেও একটা গরম হাওয়ার স্রোত টের পাচ্ছেন সে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একদিকে ২৪ জন সাবেক ও বর্তমান সেনাকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী গুম-খুনের মামলা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। অন্যদিকে ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর নজিরবিহীন হুমকি-ধমকি। যা নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়াচ্ছে।
যদিও প্রথম খবরটির চাপে দ্বিতীয় খবরটি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। এনসিপির নেতারা মুহা্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের “সেফ এক্সিট প্ল্যান” নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন সরকারের ৪-৫ জন উপদেষ্টা সেফ এক্সিট খুঁজছেন। তাঁরা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছেন।
এনসিপির আরেক ছাত্রনেত্রী সামান্তা শারমিনও ১২ অক্টোবর এক টিভি ইন্টারভিউতে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে আরও কড়া অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, প্রত্যেক উপদেষ্টা ইতিমধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে ফেলেছেন। অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে নিজেদের ‘সেফ এক্সিট’ এর ব্যবস্থা করছেন। সারজিস আলমও নিজের ফেসবুক পেজে প্রায় একই দাবি তুলেছিলেন। এনসিপি নেতাদের এই দাবির পর উপদেষ্টাদের মধ্যে মুখ খুলেছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী এবং বন, পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান।
জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী ১২ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে জবাব দিয়ে বলেন, “আমার সকল সন্তান দেশেই থাকে, কোনও ‘সেফ এক্সিট’ এর প্রয়োজন নেই”। এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের এক দাবির পর। মঙ্গলবারই ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, এই উপদেষ্টারা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছেন এবং জনপ্রশাসনকে দলীয় শাসনে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের অপকর্মের প্রমাণ আমাদের কাছে রেকর্ড আকারে আছে। আমরা সংশোধনের সুযোগ দিতে চাই, কিন্তু সময়মতো সাবধান না হলে জনসম্মুখে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে।
ওই প্রকাশ্য সম্মেলনেই জামাতের নায়েবে আমীর হুঁশিয়ারির সুরে আরও বলেন, জুলাইয়ের নিহতদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে পরিণতি আরও খারাপ হবে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, এনসিপি ও জামাতের মতো দল যখন বারংবার একই অভিযোগ তুলছে, তখন বিষয়টি খুবই গম্ভীর। কারণ, জামায়াত এবং এনসিপি—দুটি দলই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে এনসিপির নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদদের মতো প্রতিনিধিরা উপদেষ্টা পদে যোগ দিয়েছিলেন।
জামায়াতও অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে চলেছে। বলা ভালো জামায়তে ইসলামী পিছন থেকে এই ইউনূস সরকারকেই পরিচালনা করছে। কিন্তু এখন জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগেই এই দুই দলের সমন্বিত হুমকি সরকারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নির্দেশ করছে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেশকরা এই বিষয়ে দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ কেউ এই ব্যাপারটা জুলাই আন্দোলনের চেতনা থেকে বিচ্যুতির ফল বলছেন। আবার কেউ কেউ এটাকে নির্বাচনী লাভের জন্য নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, পরিস্থিতি আরও জটিল করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত করার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে এনসিপি-জামায়তে ইসলামী।












Discussion about this post