বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারত কোনও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেনি, আগামীদিনে করবে তার সম্ভাবনাও কম। আসলে ভারত যে বাংলাদেশের সাথে কোনও ‘ফুল এনগেজমেন্টে’ যাবে না সেটা এখন কার্যত দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু আচমকা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বাংলাদেশে তাঁর কাউন্টার পার্ট খলিলুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন দিল্লিতে। ২০ নভেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে অংশগ্রহণ করার জন্যই এই আমন্ত্রণ। যা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে যথেষ্টই চর্চা চলছে। মোটামুটি দিল্লির ঘোষিত অবস্থান বোঝার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বা সচিব সরকারি সফরে ভারতে আসেননি। বিগত দেড় বছরে এমন উদাহরণ একটা-দুটো ছাড়া নেই। আবার ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি ছাড়া আর কোনও সরকারি আমলা বা মন্ত্রী বাংলাদেশে যাননি।
এরকম একটা পটভূমিতে যখন জানা গেল, আগামী বুধবার দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান তাতে যোগ দেবেন, সেটা অনেককেই বিশ্মিত করেছে। তাহলে কি দু-দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে নাকি এর পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে। কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে পাঁচটি দেশ অংশগ্রহণ করে, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও মরিশাস। পাকিস্তান এই জোটে নেই। প্রসঙ্গত, পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা জোট ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’। তার পর থেকে প্রতিবছর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু এবার তা অন্য মাত্রা পেয়েছে, ঘটা করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোয়। তবে জানা যাচ্ছে, গত বছরের জুলাই মাসে এই কনক্লেভের ডেপুটি এনএসএ পর্যায়ের একটি সম্মেলন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছিল মরিশাসে। আর সেখানেই বাংলাদেশকে পূর্ণ সদস্যের মর্য়াদা দেওয়া হয়েছিল। ফলে এবারই বাংলাদেশ প্রথমবার এই নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দেবে।
তবে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই কনক্লেভের আড়ালে আরও বড় যে ঘটনা ঘটতে পারে সেটা হল অজিত ডোভালের সাথে খলিলুর রহমানের একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। যা নিয়েই মূলত সবচেয়ে বেশি চর্চা চলছে। কেন আচমকা ঘটা করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে আমন্ত্রণ জানানো হল? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এর পিছনে বড় উদ্দেশ্য রয়েছে ভারতের। সোমবারই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। তাতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড শোনানো হয়েছে। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখন ভারতেই অবস্থান করছেন। তাঁকে ভারত কার্যত রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। এটাও জানা যাচ্ছে, ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে হাসিনার ফাঁসির রায় ঘোষিত হতেই বাংলাদেশের তরফে তাঁকে ফেরত চেয়ে চিঠি দেওয়া হচ্ছে দিল্লিকে। আর সেই আবহেই দিল্লি আসছেন খলিলুর রহমান। ফলে ডোভালের সঙ্গে বৈঠকে হাসিনা প্রসঙ্গ যে উঠবে সেটা বলাই বাহুল্য।
তবে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, অজিত ডোভাল ভারতের জেমস বন্ড হিসেবেই পরিচিত, তাঁর কূটনৈতিক চালে অনেকেই কুপকাত হয়েছেন। তিনি চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিংপিন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিনের সাথে একান্ত বৈঠকও করেছেন। ফলে ভারতের আভ্যন্তরীণ এবং বাহির নিরাপত্তায় তাঁর ক্ষমতা কতটা সেটা যে কেউ জানেন। জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি দিল্লি বিস্ফোরণের তদন্তে বাংলাদেশের সঙ্গে একাধিক যোগসুত্র সামনে আসছে। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গি ও জেহাদি কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারমধ্যেই জানা যাচ্ছে, রাজশাহী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বিপুল পরিমান বিস্ফোরক ও ডিটোনেটর প্রবেশ করেছিল চোরাপথে। যা দিল্লি বিস্ফোরণে ব্যবহার হয়েছে এবং ফরিদাবাদ থেকে উদ্ধার হয়েছে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত ওই বৈঠকে এটা নিয়েও বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, খলিলুর রহমান শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। যে কারণে তাঁর আসন্ন দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন সফর—চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক আলোচনা কিংবা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিমউদ্দিন রেহমানি অথবা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুতফুজ্জামান বাবরের মতো অনেকের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হতে পারে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ। ফলে খলিলুর দিল্লি এলে যথেষ্টই চাপে থাকবেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।












Discussion about this post