বেগম খালেদা জিয়া টানা এগারো দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। সেখানে যেমন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক দল উপস্থিত রয়েছেন, তেমনই কয়েকজন বিদেশী চিকিৎসকও এসেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। খালেদা জিয়ার জন্য পুরো দেশে এখন দোয়া-প্রার্থনার পর্ব চলছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ও যেন ভারী হয়ে আছে উদ্বেগে। কিন্তু সবকিছুর থেকে বহুগূণ দূরে তাঁর ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, খালেদা জিয়ার একমাত্র জীবিত পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে বসে হা-হুতাশ করা ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না। কেন তিনি দেশে ফিরছেন না, অসুস্থ মায়ের শেষ সময়েও কেন তিনি পাশে এসে দাঁড়াতে পারছেন না, তা নিয়েই চলছে যত জল্পনা-কল্পনা।
প্রসঙ্গত, তারেক রহমান একটি পোস্টে লিখেছিলেন, তাঁর দেশে আসা একক সিদ্ধান্ত নয়। বিষয়টি স্পর্শকাতর। কেন তিনি এ কথা বললেন? এখন তো বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নামগন্ধ নেই, শেখ হাসিনার মতো শাসক নেই। যারা ক্ষমতায় আছেন তাঁরা কার্যত বিএনপির বন্ধু শ্রেণির মধ্যেই পড়েন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা যাবতীয় মামলা মকোদ্দমা প্রত্যাহার করেছে। তাঁরা এখন বেকসুর খালাস। তাহলে তারেক কেন দেশে ফিরছেন না? তাহলে কি ইউনূস প্রশাসনের কাছে থেকেই কোনও হুমকি আছে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটি আবেগের প্রশ্ন নয়। এর পিছনে রয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্র। আসলে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনও তারেকের প্রাণের গ্যারান্টি নিতে পারছে না।
এই মুহূর্তে যদি খালেদা জিয়ার প্রাণ যায়, আর তারেক এসে দলের পুর্ণমাত্রায় হাল ধরেন। তাহলে গোটা পরিস্থিতি নিমেষে বদলে যাবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে একটা আবেগী ঢেউ গোটা বাংলাদেশকেই নাড়িয়ে দেবে। আর তাতে ভেসে যাবে জামায়তে ইসলামীর তৈরি করা রাজনৈতিক জমি। সেখানে বাজিমাৎ করবে বিএনপি। এটাই তারেককে লন্ডনে আটকে রাখার একমাত্র কারণ। কারণ তারেক ঢাকায় ফিরলেই পথঘাট ভরে যাবে মানুষের ভিড়ে। টিভির পর্দা, অনলাইন নিউজ, লাইভ—সবখানে একটা আবেগের ছোঁয়া থাকবে। দেশ জুড়ে একটা আলোড়ন পড়ে যাবে। যাবতীয় ফোকাস তখন তারেকের দিকেই গিয়ে পড়বে। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্ব পড়েছেন মহা ফাঁপড়ে। তাঁরাও এখন বুঝে উঠতে পারছেন না কি করতে হবে। যদিও বিএনপি নেতারা মুখে বলছেন, তারেক মাকে ভালোবাসেন বলেই তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ঠাণ্ডা মাথায়। চিকিৎসক, পরিবার ও দলের সঙ্গে আলাপ করেই তিনি উপযুক্ত সময় বেছে নেবেন দেশে ফেরার জন্য।
অন্যদিকে মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদ বিশেষ বৈঠকে বসেছিল মঙ্গলবার সকালে। গোটা দেশ তাঁকিয়ে ছিল ওই বৈঠকের দিকে। কিন্তু বৈঠক শেষে মাত্র ৮৫ সেকেন্ডের একটি প্রেস ব্রিফিং করেন উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, “বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় হাসপাতালে খালেদা জিয়ার নির্বিঘ্ন চিকিৎসার দরকার। প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধা এবং উচ্চ মর্যাদা বিবেচনায় তাঁকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ভিভিআইপি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়”।
এর অর্থ অসুস্থ খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর একটা তোরজোর চলছে। কিন্তু তিনি সেই পরিস্থিতিতে রয়েছেন যে তাঁকে লন্ডনে বা অন্য কোনও দেশে পাঠানো যাবে? এরমধ্যেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক বসেছিল। তাতেও নাকি ঠিক হয়েছে তারেককে দ্রুত দেশে ফিরে আসতে হবে এবং মা ও দলের হাল ধরতে হবে। অর্থাৎ, বিএনপিও চাপ দিতে শুরু করলো তাঁদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। তারেকও জানেন এই মুহূর্তে যদি তিনি দেশে না ফেরেন তাহলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অস্তাচলে যাবে। কিন্তু একটা এক্স ফ্যাক্টর যে কাজ করছে তারেককে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে, সেটাও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বিএনপি ও তারেক। এখন দেখার কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।












Discussion about this post