প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে আর কয়েকদিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে। এবারের এই নির্বাচন বেশ বড়সড় একটা গুরুত্ব বহন করে, কারণ এই নির্বাচন হচ্ছে একটা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। অপরদিকে দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর নিজের জন্মভূমিতে ফিরে এসেছেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান। তিনি আসন্ন নির্বাচন এবং পরবর্তী সময় বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠন নিয়ে নানা কথা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিকী টাইম ম্যাগাজিনে। বাংলাদেশের এই নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। টাইম ম্যাগাজিন বলছে, গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানো রহমানের জন্য পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ছিল এক ঝড়ো হাওয়া। কিন্তু তাঁর দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর, তাঁর মা, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা গিয়েছিলেন। দুটি ক্ষেত্রেই কার্যত মানুষের ঢল উপচে পড়েছিল ঢাকার রাস্তায়। এ বিষয়ে তারেক বলেছেন, সাধারণ মানুষের এত উৎসাহ ও আবেগ দেখে থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হল, যখন আপনার কোনও দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে তা পালন করতে হবে। টাইম ম্যাগাজিনের এই সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান অনেক কথাই বলেছেন, তবে মজার বিষয় হল, সেটা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য নেই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে। কেন নেই, সেটা নিয়েই এবার একটু আলোচনা করা যাক।
টাইম ম্যাগাজিন বলছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমান স্পষ্টভাবে সকলের আগে আছেন। যে নির্বাচনের মাত্র ১৮ মাস আগে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হয়েছিল। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং দুর্বল টাকার কারণে ভুগছে। যা বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের প্রকৃত আয় হ্রাস করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের ফলে আমদানি বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে যা উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারেকের দাবি, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পোশাক রফতানি এবং বিদেশী রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতিকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। যুব সমাজে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিএনপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তারেক রহমানের দাবি, প্রতি বছর ২০ লক্ষ তরুণ বাংলাদেশি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করার খুব প্রয়োজন।
যদিও টাইম ম্যাগাজিন ওই প্রতিবেদনে এ দাবিও করছে যে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে স্থান দিয়েছিল। এটা খুবই উদ্বেগজনক। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমান অবশ্য যাবতীয় দোষ বিগত আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁরা কিছুই প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। টাইম ম্যাগাজিন বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁর পূর্বের সমস্ত দোষী সাব্যস্ততা বাতিল করে দিয়েছে। তবে আজকের তারেক রহমান জুলাই আন্দোলেন প্রসঙ্গে এও বলেছেন, যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের একটি অত্যন্ত, অত্যন্ত দৃঢ় দায়িত্ব রয়েছে,” তিনি বলেন। “আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার পেতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০০৭-২০০৮ সালে বাংলাদেশের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, তারেক রহমানকে ৮৪টি অভিযোগে ১৮ মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে রয়েছে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং আওয়ামী লীগের একটি কনভয়ের উপর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা। তিনি দীর্ঘদিন কারাবাসেও ছিলেন, কিন্তু পরে তিনি দেশ ত্যাগ করেন, এবং পরবর্তী ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থান করেছেন। এরপর দেশে ফেরেন এবং বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে তিনিই বিএনপির প্রধান মুখ। টাইম ম্যাগাজিনে তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, মানুষ যাতে রাস্তায় নিরাপদে থাকে, ব্যবসা করার জন্য নিরাপদ থাকে তা নিশ্চিত করা। আবার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গেও তারেক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, তারেকের দাবি, আজ যদি আপনি কোনও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন, তাহলে আগামীকাল আপনি আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না এমন আমার কী নিশ্চয়তা আছে?” তবে তিনি এও বলেন, যদি কেউ কোনও ধরণের অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তবে তাকে অবশ্যই পরিণতি ভোগ করতে হবে। সবমিলিয়ে তারেকের এই সাক্ষাৎকার ইউনূসের শাসনকালকে বিতর্কের মুখে ফেলল, আবার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে কিছুটা আশার বানীও শুনিয়ে রাখলো।
https://time.com/7358216/bangladesh-elections-tarique-rahman-profile/












Discussion about this post