২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য দুবাই ভিত্তিক বহুজাতিক সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছিল। মূলত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপি মডেলে কাজ করার সমধোতা স্বাক্ষর হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ বছরে তা চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকার। তারপর থেকে বাংলাদেশে একটা প্রচলন দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের আমলে যা কিছু হয়েছে, তা নাকি সবটাই অবৈধ। হাসিনার আমলে হওয়া একের পর এক চুক্তি, সমঝোতা বাতিল করছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে একটু মন দিয়ে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, সবটা নয়, বরং যে যে চুক্তিগুলি বর্তমান ইউনূস সরকারের জন্য লাভজনক সেগুলি বাদে। ঠিক যেমনটা চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশী সংস্থাকে দেওয়ার বিষয়টি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে তো ফ্যাসিস্ট তকমা পাওয়া শেখ হাসিনা সরকার সমঝোতা করেই রেখেছিল। তাহলে সেই সমঝোতা পাঁচ বছর পর কেন বাস্তবায়নের পথে এল ইউনূস সরকার? এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশী সংস্থাকে দেওয়ার বিষয়ের বিরোধিতায় একটি রিট দাখিল করা হয়েছিল বাংলাদেশ হাইকোর্টে। অনেকেই আশা করেছিলেন, হয়তো হাইকোর্ট রিটের পক্ষেই রায় দেবে। কিন্তু না, সেটা হয়নি, উল্টো বিচারপতিদের বেঞ্চ ওই রিট খারিজ করে দিয়ে বলে এই চুক্তি বৈধ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রিটটি দাখিল করা হয়েছিল। তা খারিজ হওয়ায় এই প্রক্রিয়া বৈধতা পেয়ে গেল বলেই মনে করছেন আইনজীবী মহল। এখানেই শেষ নয়, চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প এবং ঢাকার অদূরে পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া নিয়েও কম আলোচনা হচ্ছে না। সম্প্রতি দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই সংক্রান্ত চুক্তি সই করেছে ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, আদৌ কি একটা অন্তর্বর্তী প্রশাসন এই ধরণের চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে?
চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এবং পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালে কাজ করবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেডলগ। আর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করবে দুবাই ভিত্তিক বিদেশি অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড। বিশ্লেষকদের মতে, এই বন্দরগুলি বিদেশী অপারেটরদের হাতে তুলে দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস আসলে নিজের ঋণ পরিশোধ করছেন। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, ডিপি ওয়ার্ল্ড দুবাই ভিত্তিক সংস্থা হলেও এদের যোগাযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। আর ডেনমার্ক এবং সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ইউনূসের গাড় যোগাযোগ নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান কি করছেন? তিনি কেন একের পর এক বন্দর পরিচালনার জন্য বিদেশী অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদ করছেন না। আবার রাখাইন মানবিক করিডোর ইস্যুতে সেনাপ্রধান সরব হয়েছিলেন বলেই জানা যায়। যার ফরে কিছুটা হলেও নাকি করিডোর নিয়ে পিছু হটতে হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। যেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে, সেখানে সেনাপ্রধান কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। যদিও এর আগে ২০২৪ সালের ২১ মে বাংলাদেশ সেনার অফিসার্স অ্যাড্রেসে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার স্পষ্টভাষায় জানিয়েছিলেন, “নো ব্লাডি করিডোর”। আবার ২০২৫ সালের ২২ মে সেনাপ্রধান বলেছিলেন, করিডোর, বন্দর বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়ার এখতিয়ার নেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। কিন্তু এ সবই হচ্ছে খোলাখুলিভাবে। ফলে প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারেরও পরাজয় ঘটল!
করিডোর ইস্যু হোক বা বন্দরের হস্তান্তর, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে। এমন চুক্তিগুলি কি কোনও অস্থায়ী, অনির্বাচিত সরকার নিতে পারে? এই প্রশ্নটাই ঘোরাফেরা করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল এবং সাধারণ বুদ্ধিজীবী মহলে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই ইউনূস সরকার যেন এই ধরণের সংবেদনশীল বিষয়ে কার্যত একরোখা সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে। যা থামানোর বা বন্ধ করার কোনও উদ্যোগ বা ইচ্ছা কোনওটাই দেখা যাচ্ছে না বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের মধ্যে। তাই কেউ কেউ দাবি করতে শুরু করেছেন, জেনারেল ওয়াকার হারেননি, আসলে সবটাই সেটিং।












Discussion about this post