কথায় আছে অতি চালাকের গলায় দড়ি, এই প্রাচীন বাংলা প্রবাদটি এখন মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য একেবারে ঠিকঠাক। না গলায় দড়ি শব্দবন্ধে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই, এটা প্রবাদমাত্র। কিন্তু অতি চালাকি দেখাতে গিয়ে এখন মুহাম্মদ ইউনূস সাহেব এমন এক প্যাঁচে পড়েছেন, ফলে তাঁর সামনে পরিস্থিতি এমন যে এগোলেও বিপদ, পিছলেও বিপদ। আর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাঁর অন্ধ ভারতবিরোধিতার জন্য। বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকট ও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে যে দেশ বিনাবাক্য ব্যায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ভারতীয় সেনার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সংগ্রামে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। ৫৪ বছর পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস যখন এক পরিকল্পিত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতার শীর্ষে এসে বসলেন, তখন দাবি করা হয়েছিল, তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিদেশনীতি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, যে ষেখান থেকে আকাশ ছোঁয়া যায়। কিন্তু হল ঠিক উল্টো। বাংলাদেশের রফতানি শিল্পে যে খাত সবচেয়ে বেশি লাভজনক ছিল, সেই রেডিমেড পোশাক শিল্প এখন সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আবার অহেতুক ভারতবিরোধিতা দেখাতে গিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় বসার পরপরই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা সে দেশের সুতামিল গুলিকে এমন গাড্ডায় ফেলেছে, এর থেকে এখন বের হওয়ার কোনও জো নেই। ফলে, বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি শিল্প এখন ধ্বংসের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে।
বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। বলা হতো, বাংলাদেশ হল তৈরি পোশাকের বৃহত্তর জোগানদার। কিন্তু ইউনূস সাহেব ক্ষমতায় আসার পর তা এখন ধুঁকছে। মূল সমস্যাটা কমবেশি সবার জানা এবং এখন সবাই মোটামুটি তা বুঝতেও পারছেন। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে এক গভীর সংকটের উদ্রেক হয়েছে ইউনূস সরকারের সামনে। ভারত থেকে কম দামের সুতা শুল্কমুক্ত আমদানির প্রতিবাদে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন বা বিটিএমএ এক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। যদিও জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাময়িক আশ্বাসে তা আপাতত স্থগিত হয়েছে। কিন্তু এতে যে সংকট মিটবে না তা স্পষ্ট। বাংলাদেশ সুতামিলগুলির বর্তমান দূরাবস্থা এবং টেক্সটাইল শিল্পের গভীর সংকটের জন্য জড়িয়ে গিয়েছে ভারতের নাম। কিন্তু আবার কেউ কেউ মুহাম্মদ ইউনূসের ভুল নীতিকেও দায়ী করছেন। বিষয়টা ঠিক কি, সেটা আগে জানা দরকার। দাবি করা হচ্ছে, ভারত এমন একটি কৌশল গ্রহণ করেছে যা বাংলাদেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলস্বরূপ, যে শিল্প একসময় বাংলাদেশকে টিকিয়ে রেখেছিল, তা এখন চরম সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। আর ভারতকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে স্বয়ং ইউনূস সাহেব। বাংলাদেশ এখন ভারতের সস্তা সুতোর জালে জড়িয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। সম্ভবত এই পরিস্থিতি আগেভাগে আঁচ করতে পারেননি ইউনূস এবং তাঁর সরকারের অংশীদাররা।
আজ থেকে প্রায় ৮-৯ মাস আগে অতিরিক্ত ভারতবিরোধিতা দেখাতে গিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য ছিল, ভারত থেকে আসা সুতোর উপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। সেই মোতাবেক স্থলবন্দর দিয়ে সহজে স্থলপথে আমদানি করা সুতোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। একমাত্র সমুদ্রপথে সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আমদানি চলতে পারে বলে জানানো হয়েছিল। এটাকে ধাক্কা হিসেবে না দেখে ভারত এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায়। স্থলবন্দর বন্ধ হলেও সমুদ্রপথে ভারতীয় রফতানিকারকরা কম দামে বিপুল পরিমান সুতো বাংলাদেশে রফতানি করতে শুরু করে দেয়। মাত্র কয়েকমাসেই ভারত থেকে বাংলাদেশে সুতো রফতানি রেকর্ড বৃদ্ধি পেল। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভারতের সুতো ছাড়া বাংলাদেশের রেডিমেড পোশাক শিল্প কার্যত অচল। যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে সে দেশের স্পিনিং মিল গুলির ওপর। গত দুই মাসেই ৬০টির বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। মিলগুলোতে জমে আছে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অবিক্রিত সুতো। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন বা বিটিএমএ সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান দাবি করছেন, লোকসানে সুতা বিক্রি করতে করতে গত দুই বছরে আমাদের স্পিনিং মিলগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি হলো বাংলাদেশ ভারত থেকে সস্তায় সুতো কিনে সেগুলি থেকে পোশাক তৈরি করে বিশ্ব বাজারে বিক্রি করে। কিন্তু, বাংলাদেশ এই সস্তা সুতার প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছে যে, আজ সেই সুতোর কারণেই তাদের কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
২০২৫ সালে, বাংলাদেশ ৭০ কোটি কিলোগ্রাম সুতো আমদানি করেছিল। যার মধ্যে ৭৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সুতো শুধুমাত্র ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছিল। এই আমদানির মূল কারণ হল, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার অধীনে সুতো আমদানিতে ক্রেতাদের কোনও আমদানি শুল্ক দিতে হয় না। অন্যদিকে গত ৪ থেকে ৫ মাস ধরে বাংলাদেশে গ্যাস সঙ্কট চলছে। যার কারণে ঋণ ও ঋণ পরিশোধের সঙ্কটও বেড়েছে। সবমিলিয়ে গভীর সংকটে সুতামিলগুলি। এখানে প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিকের স্বার্থ জড়িয়ে। অপরদিকে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের দাবি, ভারতের সুতো সস্তা ও টেকসই, সেই সঙ্গে দামও কম। ফলে বিশ্বমানের পোশাক তৈরিতে ভারতীয় সুতো অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের সুতো দামে বেশি এবং কম টেকসই। ফলে আমরা যদি ভারতের বদলে দেশের সুতো কিনে ব্যবসা করতে যাই তাহলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব। টেক্সটাইল শিল্পে জড়িত প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিকের জীবন। ফলে ইউনূসেরে সামনে এখন এগোলেও বিপদ, পিছলেও বিপদ।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়।...
Read more












Discussion about this post