“আমরা, নূতন যৌবনের দূত। / আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত।/ আমরা বেড়া ভাঙি/ আমরা অশোকবনের রাঙা নেশায় রাঙি, / ঝঞ্ঝার বন্ধন ছিন্ন করে দিই- আমরা বিদ্যুৎ।। / আমরা করি ভুল – অগাধ জলে ঝাঁপ দিয়ে যুঝিয়ে পাই কূল। / যেখানে ডাক পড়ে জীবন-মরণ-ঝড়ে আমরা প্রস্তুত।। আমরা, নূতন যৌবনের দূত।”
রবীন্দ্রগানের এই “আমরা” যে কোনও দেশের তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা নূতন একটি যুগকে আহ্বান জানায়। আবার তারাই ভুল করে অগাধ জলে ঝাঁপ দেয়। জীবন-মরণ-ঝড়ের জন্য তারা সব সময় প্রস্তুত। বাংলাদেশে জুলাই-অগাস্ট অভ্যুত্থান যে ভুল করে অগাধ ঝলে ঝাঁপ দেওয়া, সেটা এখন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম উপলব্ধি করতে পেরেছে। দেরিতে হলেও।
কোনও একটি দেশের সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে প্রধান ভূমিকায় থাকে দেশটির তরুণ প্রজন্ম। আর তাদের পিছনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকে একটা স্বার্থাণ্বেষী গোষ্ঠী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল। তরুণ প্রজন্মকে বিপথে চালিত করেছিল বিশেষ একটি গোষ্ঠী। কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, আত্মবিশ্বাস ভুল পথে চালিত হয়ে চরমে পৌছাঁলে ব্যর্থ বোধির জন্ম হয়। পদ্মাপারে জুলাই-অগাস্টেরর আন্দোলন তরুণ সমাজের আত্মবিশ্বাস ভুল পথে চালিত হয়ে জন্ম দেয় একাধিক ব্যর্থ বোধির। আজ তাদের চেতনা ফিরেছে। বলা যেতে পারে, পরিস্থিতি তাদের চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে। তাই, তারা আবার শেখ হাসিনাকেই চাইছে।
জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে বাংলাদেশের নূতন যৌবনের দূতেরা রাস্তায় নেমেছিল এই অঙ্গীকার নিয়ে যে তারা একটি পুরোনা রাজনৈতিক ব্যবস্থার বদল ঘটিয়ে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ থাকবে। এককথায় সমানাধিকার। যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক হবে। তাদের অন্ধকারের অতল গহ্বরে ঠেলে দেবে না। কিন্তু এক বছর না অতিক্রান্ত হতে না হতেই সেই স্বপ্ন আজ বড়ো ধরনের প্রশ্নের মুখে। সরকার বদলেছে ঠিকই। কিন্তু রাজনীতি বদলায়নি। ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের তরুণদের সামনে দাঁড় করিয়েছে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে। তাদের এক কঠিন বাস্তবতার সামনে ফেলে দিয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। বাংলাদেশের মোট ভোটারের এক চতুর্থাংশের বেশি এই বয়সগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তারা একটি পরিবর্তন চেয়েছিল ঠিকই। পদ্মাপারে পটপরিবর্তন ঘটেছে। তবে সে পরিবর্তন দেশের নূতন যৌবনের প্রতিনিধিদের কাঙ্খিত পরিবর্তন নয়। হাসিনার আমলে সব কিছু যে ঠিকঠাক ছিল বা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিল না নয়। সেটা আওয়ামী লীগ কখনও সরাসরি বা কখনও বা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা সেই একাধিক ভুল পদক্ষেপের উদগিরণ ঘটে জুলাই-অগাস্টে। তাদের সেই অগাধ জলে ঝাঁপ দেওয়ার লক্ষ্য শুধু আওয়ামী লীগ নয়, লক্ষ্য ছিল বিএনপি।
নির্বাচন আসছে। যে কোনও একটি দল ক্ষমতায় আসীন হবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে তরুণ প্রজন্মের পথে নামা, অর্থাৎ বিকল্পের সন্ধান, সেই সন্ধানের কি ইতি ঘটতে চলেছে? এই আন্দোলন কি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে একটি নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারবে? প্রথম দিকে বেশ আশা জাগিয়েছিল ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের মধ্যে বিকল্প খুঁজে পেয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই দলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলটি সাংগঠনিক দিক থেকে দূর্বল। তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ নেই। সব চেয়ে বড়ো ধাক্কা তারা যখন জামাতের সঙ্গে জোট গঠন করে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জেন-জিদের আবারও অগাধ জলে ভাসিয়ে দেয়। তারা নিজেদেরকে প্রতারিত মনে করতে শুরু করে। এই অবস্থায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কী হবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ? বাংলাদেশই বা আগামীদিনে কোন দিকে ধাবিত হবে? তা জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
পদ্মপারে কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে।












Discussion about this post