একটাই বার্তা। সেই বার্তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সেই সংক্ষিপ্ত বার্তার অভিঘাত কতটা, সেটা বোঝা যায় তদারকি সরকার প্রধান ইউনূসের অস্থিরতা দেখে। দিল্লির আশ্রয়ে নির্বাসনে থাকা হাসিনা বিগত কয়েক মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কিছু সাক্ষাৎকার ছিল ই-মেলে। কিছু সাক্ষাৎকার ছিল অডিও। সর্বশেষ অস্ত্রটি হল দিল্লি থেকে তাঁর অডিও বার্তা। হাসিনা দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের শুরু হয় অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। সেই আদেশ কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর ছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। তারা দিল্লির কাছে এই দুইকে তুলে দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার আবেদন করে। দিল্লি সেই আবেদন গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। পদ্মাপারে পালাবদলের পর দিল্লি-ঢাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমে তলানিতে যেতে শুরু করে। আর হাসিনা এবং আসাদুজ্জমানখান কামালকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্ককে আরও অবনতি ঘটায়। সম্পর্কের অবনতি ঘটে দিল্লি থেকে হাসিনার একের পর এক সাক্ষাৎকার। সেই সব সাক্ষাৎকারে ইউনূসর যারপরনাই বিরক্ত। তারা বাধ্য হয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। হাসিনার সর্বশেষ বার্তা ছিল দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের এক কর্মসূচিতে শোনান হয় হাসিনার বার্তা। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘সেভ ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’। সেই অনুষ্ঠানের প্রেক্ষিতে ঢাকার প্রতিক্রিয়া ছিল ‘‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতকরারএবংআসন্ননির্বাচনকেব্যাহতকরারজন্যআওয়ামীলীগেরসমর্থকদেরসন্ত্রাসীকর্মকাণ্ডকরারজন্যমানবতাবিরোধীঅপরাধেদণ্ডপ্রাপ্তওপলাতকশেখহাসিনাকেনয়াদিল্লিতেপ্রকাশ্যেবক্তব্যরাখারযেসুযোগকরেদেওয়াহয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সরকার বিস্মিত এবং হতাশ হয়েছে।’’
বিদেশ মন্ত্রক থেকে আরও বলা হয়েছে, ‘‘ভারত তাঁকে (হাসিনা) নিজেদের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এরকম উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা পরিষ্কার ভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’’ এই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে বলেও জানিয়েছে ঢাকা। তারা বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে, ভারতের এই আচরণ ‘প্রতিবেশীসুলভ’ নয়। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
কী বলেছেন হাসিনা, শোনা যাক তার গলায়।
শনিবার, ৩১ জানুয়ারি হাসিনা আওয়ামী লীগের একটি আলোচনাসভায় অংশ নিয়েছিলন দলনেত্রী হাসিনা। সেই সভা থেকে তিনি ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে নির্যাতন, আর্থিক দুর্নীতি-সহ একাধিক অভিযোগ এবং নিজের ১৫ বছরের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরলেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার আওয়ামী লীগের একটি আলোচনাসভায় ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন হাসিনা। অনুষ্ঠানে তাঁর প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের দোষ কোথায়? তিনি বলেন, “১৫ বছরে বাংলাদেশে কী কী হয়েছে এবং ১৫ মাসে কী কী হচ্ছে, সব হিসাব করে দেখুক। তবে বোঝা যাবে তখন কী হয়েছে, আর এখন কী হচ্ছে।”
নির্বাচন প্রসঙ্গ তাঁর মন্তব্য নির্বাচন প্রসঙ্গে হাসিনার প্রশ্ন, সরকারি আধিকারিকদের ব্যবহার করে যদি নির্বাচন হয় তা হলে ওই নির্বাচনের লাভ কী? তাঁর বক্তব্য, “আমাদের উপর দোষারোপ করা হয়েছিল যে ২০১৮ সলের নির্বাচন প্রশাসন করে দিয়েছে, তা হলে এখন ইউনূস কী করছে?” শেখ হাসিনার মতে, অবাধ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের অস্থিরতার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। “প্রথমে প্রকৃত ছাত্র আন্দোলন শুরু হলেও পরে চরমপন্থীরা সেটি সহিংস বিদ্রোহে রূপান্তরিত করে,” বলেন শেখ হাসিনা। তিনি উল্লেখ করেন, থানা জ্বালিয়ে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় এবং যোগাযোগ পরিকাঠামো ভাঙচুরসহ পরিস্থিতি পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গনে পরিণত হয়েছিল। “এটি আর নাগরিক প্রতিবাদ ছিল না, ছিল হিংস্র জনতার তাণ্ডব,” বলেন তিনি।বাংলাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা জানান, এটি তার জন্য এক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। তবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য কোনও খুব সাধারণ নয়। তিনি বলেছেন, অবাধ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। এই বার্তা শুধু তদরাকি সরকার প্রধানের উদ্দেশ্যে নয়। এই বার্তা তিনি দিতে চেয়েছেন আন্তর্জাতিকমহলকেও। তিনি একটি জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। তাঁর এই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউনূস জানেন, এই বার্তা তাদের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ। তদারকি সরকারের মূল সমস্যা হল তারা হাসিনার রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস করতে পারছে না। যে পাঁচটি দাবিতে হাসিনাকে সরব হতে দেখা গেল, তা ইউনূস এবং তাঁর সরকারের কাছে বড়ো মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।












Discussion about this post