প্রতিবেদন শুরু করা যাক বাংলা স্বর্ণযুগের এই গান দিয়ে –
“দূরন্ত ঘূর্নির / এই লেগেছে পাক/এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন/ ছন্দে ছন্দে কত রঙ বদলায়। ”
হাসিনাকে নিয়ে ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত এবং ইওরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির সঙ্গে এই গানের ভাব অনেকটাই মিলে যায়। প্রথমে আসা যাক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে। ভারত এবং ইইউ-য়ের মধ্যে একটি চুক্তি সই হওয়ার কথা। ভারতে এসেছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোষ দা কাস্তা এবং ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার ডোয়েল। সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি ছিলেন এই দুইজন। ভারত-ইইউ বাণিজ্যচুক্তির প্রেক্ষিতে এই দুইয়ের দিল্লি সফর নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। চিন্তাভাবনা করেই যে ভারত সরকার তাদের সাধারণতন্ত্র দিবসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাদের সফরের প্রাক্কালে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আশার কথ শোনান ভারতের বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল। তাঁর কথায়, নয়াদিল্লি ও ব্রাসেলস চুক্তি চুডা়ন্ত করার একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। চুক্তির মধ্যে থাকা ২৪টি বিষয়ে মধ্যে ২০টি বিষয়ের পুরোপুরি নিষ্পত্তি ঘটেছে। বাকি কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা চলছে। সমাধানের জন্য চলছে ভার্চুয়াল বৈঠক। সম্প্রতি ভারত সফরে এসেছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ। তিনিও এই চুক্তির সম্পর্কে আশার কথা শোনান। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই চুক্তি সম্পর্কে সোমবার একটি টুইট করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার টুইট “Conclusion of the India-EU FTA marks a significant milestone in our relations. I thank all the leaders of Europe over the years for their constructive spirit and commitment in making this possible. This agreement will deepen economic ties, create opportunities for our people and strengthen the India-Europe partnership for a prosperous future.”
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০০৪ সাল থেকে কৌশলগত অংশীদার। ২০২৪ সালে দু’পক্ষের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২০ বিলিয়ন ইউরোতে, যা ইইউ-কে ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রপ্তানি সামান্য কমার পাশাপাশি আমদানিও কমেছে। তবুও আমেরিকার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নই ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি শুধু দুই অর্থনীতির সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান আরও শক্ত করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই চুক্তিতে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছেন ট্রাম্প। ইইউ যে ভারতের সঙ্গে এই ধরনের একটি চুক্তি করতে পারে, সেটা তিনি বিন্দুমাত্র কল্পনা করতে পারেননি। দিল্লির ওপর চড়া হারে শুল্ক চাপিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্পের মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁকে ফোন করে শুল্কহ্রাসের জন্য অনুরোধ করবেন। ভারত সে পথে না হেটে ইইউয়ের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে ফেলল। ফলে ভারতের তৈরি হওয়া পণ্য বিক্রির জন্য আর আমেরিকার বাজারে দিকে তাকিয়ে থাকার দরকার হবে না। ইইউ গোষ্ঠীভুক্তদেশগুলির বাজারে বিক্রি হবে ভারতে তৈরি পণ্য। এবং অবশ্য কম দামে।
এই দ্বিচারিতার ফলে, হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন ইস্যুতে ভারত আর আমেরিকার ওপর ভরসা রাখতে চাইছে না। সুষ্পষ্টভাবে ভরসা করতে পারছে না। সাউথব্লকের আশঙ্কা, আমেরিকা শেষ মুহূর্তে তাদের অবস্থান বদল করলে দিল্লি বিপাকে পড়ে যাবে। যে জামাত ওয়াশিংটনের কাছে ছিল ব্রাত্য, অচ্ছুত, একটি বিপজ্জনক দল, সেই দলকে আমেরিকা এখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় দেখতে চাইছে। সাউথব্লক বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখতে নারাজ। তাই, তারেক জিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার পাশাপাশি দিল্লি হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পথ মসৃণ করতে চাইছে। কোনও কোনও মহল থেকে এখন বলা হচ্ছে, ১২ ফেব্রুয়ারির আগেই হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত দিল্লি। বঙ্গবন্ধুকন্যা কি ১২ ফেব্রুয়ারি বা তার আগে বাংলাদেশে ফিরতে পারছেন?












Discussion about this post