২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই কার্যত উত্তপ্ত বাংলাদেশ। ভারতের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এই আবহকে আরও উত্তপ্ত করছে। এখানেই শেষ নয়, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির চিকেনস নেক ‘দখলে’র ‘ফাঁকা আওয়াজ’ও মাঝেমধ্যে উঠছে। আবার কখনও ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সেভেন সিস্টার্সকে বিচ্ছিন্ন করার ‘আওয়াজ’ উঠেছিল বাংলাদেশে। সবমিলিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। পরিস্থিতি এমন যে আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে তাঁদের ক্রিকেট দলকে ভারতে পাঠাতে নারাজ, কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ভারতে নাকি তাঁদের নিরাপত্তার অভাব আছে। তবে ভারত সরকার এখনও সেভাবে কড়া কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কিন্তু এবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একটি কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন বাংলাদেশকে। শনিবার পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর ও শিলিগুড়ি শহরে দুটি জনসভা করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এরমধ্যে শিলিগুড়ি হল একেবারে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এবং ভারতের অতি সংবেদনশীল চিকেনস নেক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। সেখানে দাঁড়িয়েই বাংলাদেশকে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন অমিত শাহ।
বাংলাদেশের নাম না নিয়ে শাহ বলেছেন , “আপনাদের বাবার জমি নাকি? এটা ভারতের জমি, কেউ হাত লাগাতে পারবে না। এই করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের সমস্ত নিরাপত্তা বাহিনী সর্বদা তৎপর রয়েছে। এই এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা হলে ভারত কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর তরফে চিকেন নেক এলাকায় একাধিক নিরাপত্তা মহড়া চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় সেনা ‘অপারেশন তিস্তা প্রহার’ নামে একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে, যার মাধ্যমে এই করিডোরের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই কূটনৈতিক মহল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে কার্যত শোরগোল পড়ে গিয়েছে। কেন আচমকা এমন মন্তব্য করলেন অমিত শাহ। উল্লেখ্য, দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়টি তাঁরই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। ফলে তিনি যখন বাংলাদেশকে হুমকি দিচ্ছেন, তখন সেটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। কারণ, চিকেনস নেক এলাকা ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটা বিষয়।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন। আবার তাঁর প্রিয় পাত্র এনসিপির ছাত্রনেতারা একাধিকবার ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখল নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এককাঠি উপরে গিয়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলিকে বাংলাদেশে জায়গা দেওয়ার কথাও বলেছেন। ফলে ভারতের জন্য এটা মারাত্মক হুমকি। এই প্রসঙ্গেই বাংলাদেশের নাম না নিয়েই অমিত শাহের খোঁচা, “আপনাদের বাবার জমি নাকি?” সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এহেন মন্তব্য করলেন খোদ শিলিগুড়ি থেকেই। অনেকেই মনে করছেন, ভারত বড় ধরণের কোনও সামরিক পদক্ষেপের চিন্তাভাবনা করছে। তাই তিনি চিকেন নেক এলাকায় একাধিক নিরাপত্তা মহড়ার বিষয়টিও যেমন উল্লেথ করেছেন, তেমনই ভারতীয় সেনার বৃহত্তর সামরিক মহড়া ‘অপারেশন তিস্তা প্রহার’ উল্লেখ করলেন। আবার অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গও টেনে আনলেন। এটা কোনও ভাবেই ফাঁকা আওয়াজ হিসেবে দেখতে নারাজ সংশ্লিষ্ট মহল। আবার তাৎপর্যপূর্ণভাবে অমিত শাহ শিলিগুড়ির মঞ্চ থেকে বললেন, চিকেনস নেক নেওয়ার হুমকির কথা শোনা যায়। ওই এলাকায় অনুপ্রবেশের অভিযোগও ওঠে। এই কথা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল। আসলে তিনি বাংলাদেশকেই বড় বার্তা দিলেন। ঘটনাচক্রে সম্প্রতি চিকেনস নেক অর্থাৎ ‘শিলিগুড়ি করিডর’-এর অদূরে বড়সড় সমীক্ষা চালিয়েছে চিন। তাঁদের সেখানে সমীক্ষা চালাতে সাহায্য করছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন চিনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এর পূর্ব দিকে সীমান্তের এপারে শিলিগুড়ি করিডর। গোয়েন্দা সূত্রে ওই খবর মিলতে কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি আরও আঁটোসাটো করা হয়েছে। এই আবহেই অমিত শাহর বার্তা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। তাহলে কি এবার বাংলাদেশকে নিয়ে অন্য পরিকল্পনা করছে ভারত? চর্চা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে।












Discussion about this post