আবার আলোচনায় ডিপ স্টেট। পূর্বতন তদারকি সরকারের উপদেষ্টা তথা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল আমেরিকা। তারা রোডম্যাপ ও স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে দিয়েছিল ডিপ স্টেট। আসিফের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার তাতে রাজি হয়নি। তারা গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার রেখে নির্বাচনের পথে গিয়েছে। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। তাঁর আগে ডিপ স্টেট নিয়ে কিছু কথা।
‘ডিপ স্টেটের’ সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্লেষক, সাংবাদিকরা এটিকে নিজেদের বোঝাপড়া অনুযায়ী ব্যাখ্যা করলেও, সবার কথায় একটা বিষয় প্রায় একই—রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তরালে থাকা গোপন ও শক্তিশালী চক্রের এক্তিয়ার বহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার। ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবার্ট কাপলান তাঁর বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রেই একটি অদৃশ্য ‘স্থায়ী কাঠামো’ থাকে যা সরকার পরিবর্তন হলেও অপরিবর্তিত থাকে, যারা মূলত জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দোহাই দিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। নিউইয়র্ক টাইমসের দীর্ঘ সময়ের হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক মাইকেল ক্রাউলি ‘ডিপ স্টেটকে’ বলে থাকেন ‘অদৃশ্য রাষ্ট্র’। তার মতে, এই শব্দ দিয়ে এমন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করা হয়, যারা বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। তার মতে, বিশেষজ্ঞরা মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে ‘ডিপ স্টেট’ শব্দ ব্যবহার করেন, যেখানে নামমাত্র গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আড়াল থেকে সামরিক ও গোয়েন্দা প্রধানরাই আসল কলকাঠি নাড়েন এবং প্রয়োজন মনে করলে নির্বাচিত নেতাদের সরিয়ে দিতে পারেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র। ঢাকার বাংলামোটরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদের আসলে “ডিপ স্টেট” বলা হয়, তাদের থেকে আমাদের অফার করা হয়েছিল যে আপনারা শেখ হাসিনা সরকারের যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটা শেষ করেন। আপনারা শেষ করেন, আমরা আপনাদের সহযোগিতা করি।’
আসিফ বলেন, ‘তাদের (ডিপ স্টেট) কিছু শর্ত ছিল যে তাদের কিছু কিছু জায়গায় ফ্যাসিলিটেটেড করা। এবং তারা পুরো রোডম্যাপও করে নিয়ে আসছিল যে বিএনপির নেতাদের তো সাজা আছে; তো সাজা থাকলে সাধারণভাবে নির্বাচন দিলেও তারা নির্বাচন করতে পারবে না। তো তাদের সাজাগুলো আদালতের মাধ্যমে লেংদি (দীর্ঘায়িত) করে আপনারা তো জানেন, সেটা কীভাবে করা যায়। আদালতের ডেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে…তারেক রহমানের নিজের নামেও সাজা ছিল। সে যদি সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকত, নির্বাচন হলেও তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না।’
কীভাবে ক্ষমতায় থাকা যায়, সেই কৌশল সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করে আসিফ বলেন, ‘আমরা কিন্তু তাতে সায় দিইনি। আমরা সব সময় গণতন্ত্রকেই সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি কমিটমেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল বলেই নির্বাচনটা হয়েছে। নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য আমরা আগবাড়িয়ে পদত্যাগ করে চলে এসেছি।’ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসনের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার মতো বিষয়ও সেই প্রস্তাবে ছিল বলে দাবি করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার ডিপ স্টেটের সেই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি। সরকার নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। ফলে সরকার তাদের (ডিপ স্টেট) সঙ্গে সমঝোতায় যায়নি।’ আসিফের এই বিবৃতিতে স্পষ্ট যে আমেরিকার অভ্যাস কোনওকালেই বদলাবে না। প্রেসিডেন্টপদে বদল হলেও তাদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য এক থেকে যাবে।











Discussion about this post