মঙ্গলবার আর জি কর কাণ্ড নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা শুনেছে শীর্ষ আদালত। শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি একের পর এক প্রশ্ন তুলে নাজেহাল করেছেন রাজ্য সরকারের আইনজীবীদের। এদিন শুনানির শেষে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে আর জি কর হাসপাতালে হামলার ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট তলব করেই ক্ষান্ত হয়নি সুপ্রিম কোর্ট। বরং আর জি কর হাসপাতাল এবং ছাত্রাবাসের নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী বা সিআইএসএফকে নির্দেশ দিয়েছে অবিলম্বে আর জি কর হাসপাতালের বাহিনী মোতায়েন করতে। এই রায়কে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্বাগত’ জানালেও ভিতর ভিতর তাঁরা অন্য কথা বলছেন। সবমিলিয়ে দ্বিধায় রয়েছে শাসকদল, তাই প্রতি পদক্ষেপ মেপে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন তৃণমূলের শীর্ষনেতারা।
যদিও তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে, আর জি করের ঘটনা নিয়ে আন্দোলনের ঝাঁজ যত তারাতারি সম্ভব কমে যাক। জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি, চিকিৎসকদের ক্ষোভ, সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ প্রশমিত করা এখন শাসকদলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়কেই হাতিয়ার করতে চাইছে তৃণমূল। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে জোরদার ধাক্কা খেয়েছে রাজ্য সরকার। পুলিশ প্রশাসনকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি। এই রায়কে নিজেদের জয় হিসেবে দেখতে চাইছে বিরোধী দলগুলি, রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ তুলে শাসকদলকে বিঁধতে ছাড়ছে না বিরোধীরা। কিন্তু এই আবহেও সুপ্রিমকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে তৃণমূল। সেই সঙ্গে সুকৌশলে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পর জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন তুলে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে শাসকদল। মঙ্গলবারই সাংবাদিক করে তৃণমূল কংগ্রেস। সেখানে তৃণমূলের দুই মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদার এবং কুণাল ঘোষ উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে জয়প্রকাশ মজুমদার প্রশ্ন তোলেন, আন্দোলনরত চিকিৎসকরা জাস্টিস চাইছেন, সুপ্রিম কোর্ট সেই জাস্টিসের জন্যই পদক্ষেপ করল। তবে কেন এখনও আন্দোলন চলছে? তিনি দাবি করেন, এই আন্দোলন সমগ্র চিকিৎসক সমাজ করছেন না। কতিপয় চিকিৎসক এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ইন্ধন দিচ্ছেন।
আর জি কর হাসপাতালে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার নির্দেশ প্রসঙ্গে তৃণমূলের নতুন মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য কুণাল ঘোষ জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি আর জি কর হাসপাতালে কেন্দ্রীয় বাহিনী দেয়, তা হলে তৃণমূলের কোনও আপত্তি নেই। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, ওই হাসপাতালে টার্গেট করে অশান্তি করছে রাম-বাম অপশক্তি। ওদের প্ররোচনা, ওদের উস্কানি, ওদের হামলার ছক, এবার ওদের বাহিনী সামলাক। কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যে এই বক্তব্য রাখলেও, তৃণমূলের অন্দরে এখন অন্য আশঙ্কা। তৃণমূল নেতাদের একাংশ জনান্তিকে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়। সেখানে সিআইএসএফ যদি আর জি করের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় তাহলে এটা ভবিষ্যতের জন্য বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। তৃণমূল নেতাদের আশঙ্কা, এটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াল। পরবর্তী সময় অন্য কোনও হাসপাতালে এরকম ধরণের ঘটনা ঘটলে, বা ডাক্তারদের উপর হামলার ঘটনা ঘটলেই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা চেয়ে আন্দোলন শুরু হয়ে যেতে পারে। আবার এই দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আদালতও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার নির্দেশ দিতে পারে। আবার একাংশ মনে করছেন, এখন যা পরিস্থিতি, এই নির্দেশ দেখিয়ে অন্যান্য হাসপাতাল থেকেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবি উঠে আসতে পারে। মামলাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আরও চাপ বাড়বে রাজ্য প্রশাসনের। তখন সামলানো আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আরেকটি বিষয় সামনে আসছে, সেটা হল সুপ্রিম কোর্টের এই রায় কলকাতা পুলিশের উপর অনাস্থার সামিল। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।
তৃণমূল গোটা বিষয় থেকে নজর ঘোরাতে এখন সিবিআইয়ের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। আর জি কর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্ত যাতে দ্রুত শেষ করে প্রকৃত দোষীদের ধরে চার্জশিট পেশ করে সে বিষয়ে দাবি তুলছে শাসকদল। সাংবাদিক সম্মেলনে কুণাল ঘোষ সেই দাবিই তুললেন।
সবমিলিয়ে আর জি কর কাণ্ড নিয়ে শাসকদল যে চাপে পড়েছে সেটা তৃণমূল নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট। এবার কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের উপর পাল্টা চাপ তৈরি করে পরিস্থিতি ঘোরানোর মরিয়া চেষ্টা করছে তৃণমূল কংগ্রেস।












Discussion about this post