২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর, ঠিক বড়দিনের একদিন আগে গ্রেফতার হয়েথিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী তথা তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির দায়ে পরপর গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের মাথারা। যেমন, বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্য. সুবীরেশ ভট্টাচার্য, শান্তিপ্রসাদ সিনহা প্রমুখ। কয়েকমাসের মাধায় ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর, রেশন দুর্নীতির তদন্তে নেমে এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেটের হাতে গ্রেফতার হন তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। শুধু তাই নয়, শিক্ষা দুর্নীতির মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহাও। আবার বীরভূম জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা এলাকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অনুব্রত মণ্ডলও এখন তিহাড় জেলে বন্দি। বিরোধীদের বক্তব্য, তৃণমূল এখন দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। এবার আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় উঠে আসছে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতির দাবি। যদিও বছরখানেক আগেই আর জি কর হাসপাতালে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত জাদুকাঠির বলে সেই অভিযোগ বারবার ধামাচাপা পড়েছিল। কিন্তু এবার পালে বাঘ পড়েছে। আর জি কর হাসপাতালের সদ্য প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে নিয়ে ক্ষোভের আগুন এখন দাবানলে পরিনত হয়েছে। যা নেভানোর কোনও উপায় নেই বলেই মনে করছেন চিকিৎসক মহলের একাংশ। প্রথমে কলকাতা হাইকোর্ট, পরে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নবানে জর্জরিত রাজ্য সরকার অবশেষে সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা এসআইটি গঠন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত দেরিতে কেন বধোদয় হল নবান্নের?
তৃণমূল ঘণিষ্ঠ হিসেবে সুপরিচিত সন্দীপ ঘোষ। আদি বাড়ি উত্তর ২৪ পরগণার বনগাঁয়। কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজ থেকেই এমবিবিএস হয়েছিলেন। এরপর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে পদ পান। ২০২১ সালে পদদোন্নতি হয় তাঁর, একেবারে অধ্যক্ষ হয়ে আসেন আর জি করে। সেই শুরু, এরপর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ। দুবার বদলির অর্ডার এলেও তিনি থেকে গিয়েছেন স্বমহিমায়। স্বাস্থ্যভবন প্রথমবার তাঁকে বদলি করে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সেই অর্ডার বাতিল হয়। তিনি ফিরে আসেন আর জি করে। এরপর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আবার বদলির অর্ডার এসেছিল, কিন্তু ২১ দিনের ব্যবধানে সন্দীপ ঘোষ ফের ফিরে আসেন আর জি করে। এবার হাসপাতালের ভিতরই এক তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও প্রথমে আত্মহত্যার তত্ত্ব খাঁড়া করেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রবল চাপে তিনি গত ১৫ আগস্ট সকালে পদত্যাগ করেন আর জি কর হাসপাতালের অধ্যক্ষ পদ থেকে। কিন্তু তাঁর প্রভাব এতটাই যে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ হিবেসে বহাল করে স্বাস্থ্যভবন। কিন্তু সেখানকার পড়ুয়া চিকিৎসকদের চাপে কাজে যোগ দিতে পারেননি। পরে কলকাতা হাইকোর্টের ধাক্কায় তাঁকে ছুটিতে পাঠায় স্বাস্ত্যভবন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন কোন বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে আর জি কর হাসপাতালের সদ্য প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে। উত্তর হচ্ছে, এক নয় একাধিক।
সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে হাসপাতালের অর্থ নয়ছয় থেকে শুরু করে স্বজনপোষণের একাধিক অভিযোগ সামনে আসছে। করোনা মহামারীর সময় কোটি কোটি টাকার অত্যাধুনিক যন্ত্র কিনেছিল আর জি কর হাসপাতাল। জানা যায় সাড়ে চার লাখ টাকায় কেনা একেকটি যন্ত্রের বাজার মূল্য দেড় লক্ষ টাকা। সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ তিনি প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার ডাকতেন। এছাড়া অবৈধভাবে ইন্টার্ণ নিয়োগ, ল্যাব টেকনিশিয়ান নিয়োগের মতো অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের বর্জ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তালিকায়। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই নির্যাতিতার হত্যার তদন্ত শুরু করেছে। সন্দীপ ঘোষকে টানা পাঁচদিন পরপর জেরা করছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। অপরদিকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রভাব খাঁটানোর অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠেছে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টেও। আর জি করের সদ্য পাক্তন অধ্যক্ষ আদালতের নজরে রয়েছেন। এখন দেখার, শিক্ষা এবং খাদ্য দফতরের দুর্নীতির মতো স্বাস্থ্য দফতরের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয় কি না আদালত।












Discussion about this post