জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান বর্তমানে খবরের শিরোনামে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রকাশ্য এক অনুষ্ঠানে বেশ কিছু মন্তব্য করেছিলেন বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও শাসকদের সম্পর্কে। সাত দিন পার হলেও সেই মন্তব্যগুলি নিয়ে বিতর্ক, কাঁটাছেঁড়া ও গুজব থামার লক্ষণ নেই। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, জেনারেল ওয়াকার উজ জামান মৌচাকে ঢিল মেরেছেন।
জানা যাচ্ছে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এই মন্তব্য করার পরই তাঁকে তলব করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এবং প্রশাসনিক কর্তা। সকলের সামনেই মুহাম্মদ ইউনূস জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের কাছে জানতে চান কেন এবং কিসের ভিত্তিতে তিনি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তিনি এই ধরণের মন্তব্য করেছেন। এও জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠক উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। সেনাপ্রধানও তাঁর মতো করে জবাব দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধানের মধ্যে সম্পর্ক যেন সাপে-নেউলের মতোই উত্তপ্ত। একদিকে সেনাপ্রধান চেষ্টায় আছেন প্রধান উপদেষ্টাকে পদ থেকে সরাতে ও গ্রেফতার করতে, অপরদিকে একই চেষ্টায় রত প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি চেষ্টায় আছেন যে কোনও মূল্যে ওয়াকার উজ জামানকে পদ থেকে সরাতে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে এখন জোরদার অভ্যন্তরীণ লড়াই চলছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানকে যদি তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারেন মুহাম্মদ ইউনূস, তাহলে কি হবে? বিশেষ সূত্রের খবর, যেদিন ইউনূস সাহেব ওয়াকার উজ জামানকে তলব করেছিলেন, সেদিন সেখানে উপস্থিত এক ছাত্র-উপদেষ্টা তাঁকে যথেষ্ট অপমান করেন। শোনা যাচ্ছে, ওই ছাত্র-উপদেষ্টা ওয়াকার উজ জামানকে সরাসরি ভারতের দালাল বলেও তোপ দেগেছিলেন এবং এই বলে সতর্ক করেছিলেন যে, এই বিপ্লবী সরকার তা কোনও ভাবেই মেনে নেবে না। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে সেনাপ্রধানকে নিয়ে যথেষ্টই বিব্রত মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টামন্ডলী। যদি ধরেই নেওয়া যায় যে ওয়াকার উজ জামানকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হলেন তাঁরা, তাহলে নতুন সেনাপ্রধান কে হবেন?
সম্প্রতি বাংলাদেশের তদারকি সরকার বছর পনেরো আগে ঘটে যাওয়া পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যা নিয়ে বিতর্কও চলছে বাংলাদেশে। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজের বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে ওই হত্যাকাণ্ডের পিছনে তৎকালীন বিডিআর সদস্যরাই জড়িত ছিলেন। সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বহুদিন আগেই সম্পন্ন হয়েছে, এখানে কোনও যদি বা কিন্তু নেই। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নতুন করে তদন্তের নাটক করে মূলত ভারতকেই দোষী প্রমানিত করতে চাইছিল। কিন্তু সেনাপ্রধান সেই তত্ত্ব নাকচ করে আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন। স্বভবতই ক্ষেপে লাল ইউনূস-সহ উপদেষ্টামণ্ডলী। তাই তাঁরা চাইছেন যত দ্রুত সম্ভব হঠাতে হবে সেনাপ্রধানকে। গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর এক এক করে হাসিনাপন্থী বেশ কয়েকজন সেনাকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছে ইউনূস প্রশাসন। তাঁদের অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছে। অপরদিকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সেনায় পাকিস্তানপন্থী যে সমস্ত সেনাকর্তারা রয়েছেন, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ সেনাক্যাম্পে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো শুরু হয়েছে। এমনও জানা যাচ্ছে, ওয়াকার-সহ হাসিনাপন্থী যে কয়েকজন সেনাকর্তা আছেন, তাঁদের তালিকাও তৈরি হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। এবার সেই তালিকা ধরে ধরে গ্রেফতার করার তোড়জোড় শুরু হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াকার উজ জামানও হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। তিনিও নিজের মতো করে গুটি সাজাচ্ছেন। অপরদিকে ভারতও বসে নেই। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন আধিকারিকের তালিকা শেখ হাসিনা তুলে দিয়েছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের হাতে। তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে সেই তালিকায় থাকা সেনাকর্তাদের স্যাটেলাইট ফোনে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ফলে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের পাশে দাঁড়িয়েছেন আরও কয়েকজন বাংলাদেশী সেনাকর্তা। অন্যদিকে বাংলাদেশে গুজব ইতিমধ্যেই কয়েকজন সেনাকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সবমিলিয়ে খেলা জমে উঠেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, সে দেশে খুব শীঘ্রই একটা সেনাবিদ্রোহ হতে পারে। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইউনূস ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। আর সেই আশঙ্কায় ভুগতে শুরু করেছেন মুহাম্মদ ইউনূস স্বয়ং। সেই কারণেই তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি ভারত সম্পর্কে নরম নরম কথা বলেছেন। এমনকি এ দাবিও করেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। এখন দেখার, এই আবহে কে কাকে হারিয়ে বাজিমাত করেন। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নাকি মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা।












Discussion about this post