জামাতে ইসলামিকে এখন আর কষ্ট করে মাঠ গরম করতে হচ্ছে না। তাদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার সিংহভাগ কাজ করছে বিএনপি। প্রশ্ন উঠতেই পারে – সেটা কীভাবে সম্ভব? দুটি দলই সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দল। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন। দুটি দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভিন্ন। তাদের স্বার্থ ভিন্ন। তারপরেও কেন বলা হচ্ছে জামাতের হয়ে কাজ করে দিচ্ছে বিএনপি। সমীকরণটি খুব সহজ যেমন নয়, তেমনই কাজটি খুব কঠিন নয়। রাজনীতির পাশা খেলায় জামায়াত এমন একটা চাল চেলেছে যেখানে বিএনপি এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই জামায়াতের দেখানো পথে হাঁটছে। এই প্রতিবেদনে সেটাই তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভাগ্য এখন বেশ ভালো। তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে পায়নি। পেয়েছে জামায়াতকে। এরকম একটা চিত্র কল্পনা করা যেতা পারে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তারা বিএনপির সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় টক্কর দিয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি বলে তারা প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারা বিরোধী আসনে বসলে তারেক রহমানের পক্ষে সরকার চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ত। কিন্তু জামায়াত আওয়ামী লীগের দেখানো পথে হাঁটতে নারাজা। তাঁরা বিরোধীদলের কাজ করছে। দলে রয়েছে বেশ কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ, যারা জামায়াতের কট্টরপন্থী ভাবমূর্তিকে মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর। তারা বিএনপিকে অযথা ঝামেলার মধ্যে ফেলতে চাইছে না।
যদি জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কি এতো সহজে ছেড়ে দিত? বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেটা কখনই হত না। বিএনপি তখন আওয়ামী লীগ, বামসংগঠন অন্যদলগুলিকে নিয়ে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলত। রাষ্ট্র অচল করে দিত। জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত আগের থেকে অনেক মজবুত। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে পারত না। সেইরকম পরিস্থিতি তেমন হয়তো তৈরি হয়নি। তাই, তাদের ক্ষমতার কাছাকাছি এসেও তারা ক্ষমতায় আসীন হতে পারেনি।
জামায়াত কীভাবে বিএনপিকে দিয়ে তাদের কাজ করিয়ে নিচ্ছে। জামায়াত রাজনীতিতে এমন এক মানদণ্ড তৈরি করেছে যা বিএনপির জন্য মরণ-বাঁচন হয়ে উঠেছে। সোহরাবর্দি উদ্যানে জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমান বলেছিলেন, আমরা ক্ষমতা গেলে বা আমাদের প্রার্থীরা সাংসদ হলে তারা রাষ্ট্রের কোনও প্লট গ্রহণ করবেন না। শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা নেবেন না। এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ করবেন। এলাকায় কোনও উন্নয়নমূলক কাজ হলে কাজের শেষে সেই কাজের পাই টু পাই হিসেবে জনগণের সামনে পেশ করবেন। এটা ছিল এক বিশাল ঘোষণা। বাংলাদেশে কেউ মন্ত্রী বা সাংসদ হলে পোয়া বারো। নির্বাচনের দুইদিন পর মিডিয়ার সামনে এসে শিশিরমণির আবারও নির্বাচনে দেওয়া তাদের সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাদের বিজয়ী প্রার্থীরা শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খেলা ঘুরে গেল এখানেই।
জামাতের ঘোষণায় ক্ষমতায় আসীন শাসকদল এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়ে দেন, তিনি সরকারি গাড়ির পরিবর্তে তারেক নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার করবেন। গাড়ির জন্য জ্বালানি তিনি নিজেই কিনবেন। বুধবার তিনি গিয়েছিলে সাভার ও শের-এ-বাংলায়। গিয়েছিলেন নিজের গাড়ি টয়োটায় চেপে। সেখান থেকে সচিবালয় যান ওই গাড়িতে। যান-জটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এতোদিন প্রধানমন্ত্রীর কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা ছিল ১৩ থেকে ১৪। সেটা কমিয়ে চারটি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে গাড়ি ব্যবহার করবেন, সেই গাড়িতে থাকবে না জাতীয় পতাকা। বিদেশি কোনও অতিথি এলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া বা তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় গাড়ির বনেটের সামনে থাকবে জাতীয় পতাকা। এটা জামাতের কৌশল। বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে ছিল। ফলে, তাদের দলের কোনও নেতা সরকারি সুবিধা নেওয়া থেকে বঞ্চিত ছিলেন। স্বভাবতই বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হলে দলের জয়ী সাংসদরা সরকারি সুবিধা নেবেন এটাই ছিল ধারণা। সেই ধারণা কুঠারাঘাত করল জামায়াত।












Discussion about this post