ত্রয়োদশ নির্বাচনেরম মাত্র তিনদিন আগে আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। পূর্বতন তদারকি সরকারের তরফে এই চুক্তিকে অত্যন্ত গোপনীয় বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল এই চুক্তি প্রকাশযোগ্য নয়। অথচ চুক্তি সইয়ের পরের দিন ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে চুক্তির চূডা়ন্ত কপি প্রকাশ করে দেয়। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তি দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য হলেও চুক্তির বয়ান পড়লে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে কেউ তাঁর দেশকে কতটা ঘৃণা করলে, কতটা স্বার্থাণ্বেষি হল নিজের দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্বকে জলঞ্জলি দিয়ে এরকম একটি চুক্তি করতে পারে। এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দুই দেশের বাৎসরিক বাণিজ্য ৮০০ কোটি ডলার। তবে বিস্ময়করভাবে রফতানিতে বাংলাদেশ আমেরিকার থেকে এগিয়ে। বছরে গড়ে ৬০০ ডলারের পণ্য রপ্তানির বিনিময়ে আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য।
গত বছর এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭% শুল্ক আরোপের ঘোষণ করেন। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি দেখিয়েছিলেন। ফলে, ঘাটতি হ্রাসের জন্য বাংলাদেশ ওয়াশিংটন দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। অবশেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত বছর ১ অগাস্ট ঘোষণা করেন বাংলাদেশের শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ তৃ্প্তির ঢেকুর শোনা গিয়েছিল। বলা হয়েছিল, দরকষাকষিতে মূলত বাংলাদেশের জয় হয়েছে। তবে বিনিময়ে দুই দেশের মধ্যে যে বাণিজ্য চুক্তি হবে, সেটি ‘তেমন বড় কিছু নয়’। সর্বশেষ এ মাসের ৯ তারিখে চুক্তি সাক্ষর হল, বিনিময়ে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমে ১৯ শতাংশে নেমে আসে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে, ১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১৫শ’ কোটি ডলারের, তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল হিসেবে তুলা কিনবে, বছরে প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে। টাকার অঙ্কে বেশ বড়সড় শোনানো এসব সংখ্যা নিয়ে বেশ হইচই হলেও এই চুক্তির সমস্যা মূলত অন্য জায়গায়। আমেরিকার পণ্যেরে জন্য আমদানি শুল্ক শূন্য করা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানি করা, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুলে দেওয়া, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ব্যবসা করতে না পারা, দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করাসহ চুক্তির প্রায় প্রতিটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।যেসব পণ্য নিয়ে চুক্তি হয়েছে সেটা শুনলেও বিস্মিত হতে হয়। কৃষিজাত পণ্য থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য, ওষুধ, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, মাংস, চিজ–কি নেই সেই তালিকায়। ৫.১ নম্বর ধারার অংশবিশেষটা এরকম: যুক্তরাষ্ট্র খনিজ সম্পদ উত্তোলন থেকে শুরু করে অনুসন্ধান, পরিবহন, বিতরণে সরাসরি অংশ নেবে, সেখানে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগ আমেরিকাকে দিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকার পণ্য যখন ঢুকবে, বাংলাদেশ সেখানে কোনো ধরনের কোটা আরোপ করতে পারবে না, কোনো ধরনের পরীক্ষা বা মান নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে না।
বাংলাদেশে শ্রম আইন হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দমত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড এখানে প্রযোজ্য হবে না। কোনো কারণে বাংলাদেশ যদি শ্রম আইন মানার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একতরফা শাস্তি দিতে পারবে, মানে শুল্ক বাড়িয়ে দিতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে যে, বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চগুলোতে শ্রম অধিকার বিষয়ক যেসব নীতিমালা আছে তা যথেষ্ট নয়, সেক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের পোশাকের ওপর শুল্ক বাড়াতে পারবে।চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ডেটা লোকালাইজেশন করতে পারবে না, ডিজিটাল সার্ভিসের ওপর ট্যাক্স বসাতে পারবে না, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নীতি সমন্বয় করতে হবে। তার মানে হল, যদি বাংলাদেশ ফেইসবুক বা গুগলকে স্থানীয়ভাবে সার্ভার স্থাপন করতে বলে সেটা তারা শুনতে বাধ্য নয়, আমাজান তার বিক্রি করা পণ্যের ওপর ট্যাক্স দেবে না। ডিজিটাল অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিজস্ব একটি কোম্পানি বিনিয়োগ করার সময় যেসব সুবিধা পাবে, আমেরিকার একটা কোম্পানিকেও অনুরূপ সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু আমেরিকার কোম্পানি যদি পরিবেশ দূষণ করে, তার জন্য বাংলাদেশ তাকে শাস্তি দিতে পারবে না।












Discussion about this post