জামায়তে ইসলামী ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর সুদীর্ঘ ইতিহাসে তাঁরা একদিকে যেমন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামিক ভাবধারা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তথা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়ে আল বদর, আল সামসের মতো দুর্ধর্য বাহিনী তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিল। আবার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং মহিলা-শিশুদের উপর অত্যাচার করে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তাঁদের তুলে দেওয়ার নজিরও রয়েছে জামাতের বিরুদ্ধে। আসলে প্রথম থেকেই দলটি ‘ইকামতে দ্বীন’ বা ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠা’কে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বর্তমানে জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চাইছে, বিশেষত জোট রাজনীতিতে। গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে জামায়তে ইসলামী একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই মুহূর্তে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য আসন সমঝোতার ইস্যুতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ইতিমধ্যেই ভাঙন ধরেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬৮ আসনে দলীয় প্রার্থীদের এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। জামায়াতের মূল যে লক্ষ্য ‘আল্লাহর আইন’ প্রতিষ্ঠার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া তা আর কারও জানা বাকি নেই। আর এই কারণেই বাংলাদেশের দীর্ঘ পাঁচ দশকে জামায়তে ইসলামী কোনও দিনও ক্ষমতার কেন্দ্রে আসতে পারেনি। কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির হাতে মার খাওয়া জামায়তে ইসলামী এবার মরিয়া চেষ্টা করছে বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরতে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করেন, এই দীর্ঘ সময়ে জামায়তে ইসলামী খুব ধীরে ধীরে একটা প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগিয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশে নিজস্ব মানবসম্পদ উন্নয়ন-সহ শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বহু ইতিবাচক কাজ করেছে। জামায়তে ইসলামী বহু মাদ্রাসা যেমন পরিচালনা করে তেমনই মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা সরকারি চাকরির জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালিয়ে আসছে। এই সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যে মানবসম্পদ বের হয় তাঁদের সিংহভাগই বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এবং তাঁদের মধ্যে জামাতের আদর্শ গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এর সুফল গণঅভ্যুত্থানের পর পেতে শুরু করেছে জমাত শিবির। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং সেনাবাহিনীর মধ্যেও বহু সদস্য জামাতপন্থী। তাই তাঁরা ভেবেই নিয়েছিল, আওয়ামী লীগ বিহীন বাংলাদেশে এবার ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসবে। এই কারণেই জামায়তে ইসলামী বিএনপিকেও মাইনাস করার লক্ষ্যে কাজ অনেক দুর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাঁদের বাড়া ভাতে ছাই ফেলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই এখন মনে করছেন, জামাত নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারলো। কারণ হিসেবে তাঁদের যুক্তি, একেবারে নিচু তলা থেকে শীর্ষপদ পর্যন্ত বাংলাদেশে আল্লাহর আইন বা শরিয়াহ আইন স্থাপনার স্বপ্ন দেখে আসা জামাতের পথভ্রষ্ট হওয়ার দিকটি। কারণ ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কলে এসে জামায়তে ইসলামী যে দাবি করছে, সেটা আগের চিন্তাধারা থেকে অনেকটাই আলাদা। জামায়তে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এখন দাবি করছেন, তাঁরা বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না, বরং তাঁরা প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই দেশ শাসন করতে চান। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, আচমকা কি হল জামায়তে ইসলামীর? বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই তাঁদের রূপ পরিবর্তন হচ্ছে কেন! আসলে তারেক রহমান দেশে ফেরা এবং পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাব বুঝেই তাঁরা কিছুটা নীতি পরিবর্তন করেছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। সেই সঙ্গে ভারত যে তাঁদের মোটেই পছন্দ করে না সেটাও তাঁরা জানেন। সবমিলিয়ে জামাতের লক্ষ্য এখন যেনতেন প্রকারেণ বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসা। সেই লক্ষ্যেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে জামাত শীর্ষ নেতৃত্ব বোঝাতে চাইছেন আল্লাহর আইন নয়, বরং গণতন্ত্রেই তাঁদের আস্থা। চাপে পড়ে এটা নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার মতো ঘটনা।












Discussion about this post