ধানমন্ডির ধ্বংসস্তূপে পাকিস্তানের ছায়া! গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমনই তত্ত্ব সামনে আসছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন, ও হাসিনার দেশত্যাগের পর ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটির ওপর এসেছিল চরম আঘাত। সেখানে আগুন ধরিয়েছিল উত্তেজিত ছাত্র-জনতা। প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ি। এরপর থেকে কার্যত পরিত্যাক্ত অবস্থায় ছিল বাড়িটি। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জ্বলন্ত প্রমান হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। যা একেবারেই সহ্য হচ্ছিল না পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীদের।
সেই কারণেই গণঅভ্যুত্থানের ঠিক ছয় মাসের মাথায় পুনরায় আক্রান্ত হল সেই বাড়ি। এবার সেই বাড়িটি বুলডজার, এসকাভেটর দিয়ে একেবারেই ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ দাবি করছেন, ৭১-এ পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যেভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তা কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তান। যেমনটা এখনও কাশ্মীর যে ভারতের অবিচ্ছেদ অংশ, সেটা তাঁরা মেনে নিতে পারছে না। সেই ১৯৭১ সালের পর থেকেই পাকিস্তানের বহু রাজনৈতিক নেতা ও সেনাকর্তা বহুবার দাবি করেছেন যে বাংলাদেশের এই স্বাধীনতার বদলা তাঁরা নেবেন। এমনকি ৫০ বছর বাদে হলেও তাঁরা বদলা নেবেন। আর কার্যত সেটাই হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এসে সেই পাকিস্তানের পথেই হাঁটা শুরু করেছে বাংলাদেশ। যা কোনও মতেই অস্বীকার করার জায়গায় নেই।
বিশেষজ্ঞ মহল একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, তা হল, ধানমন্ডির ঘটনার পিছনে অন্য কোনও খেলা চলছে? এই ঘটনা কাঁটাছেঁড়া করে যা উঠে আসছে সেটা হল, প্রায় ৭২ ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চলছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। শুধু বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নয়, বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন সেনাপ্রধান, শেখ হাসিনার বাড়ি সুধা সদন, আওয়ামী লীগের বহু নেতার বাড়িতেও চলেছে ভাঙচুর,, অগ্নিসংযোগ। কিন্তু নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে দেখেছে সে দেশের পুলিশ ও সেনা। ফলে এমন অভিযোগও উঠেছে, তদারকি সরকারের মদতেই এভাবে ভাঙচুর চালানো হয়েছে গোটা বাংলাদেশে। প্রথমে এই সমস্ত ঘটনার দায় শেখ হাসিনার ঘাড়ে ঠেলে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল তদারকি সরকার। এমনকি ভারতে বসে শেখ হাসিনা যে প্ররোচনা বা উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখছেন, সেটা বন্ধ করার জন্য ভারত সরকারের কাছেও চিঠি পাঠিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে ঢাকায় অবস্থিত ভারতের উপ রাষ্ট্রদূতকে তলব করেও এ বিষয়ে অবগত করানো হয়। উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট, শেখ হাসিনা ও ভারতকে এক আসনে বসিয়ে দেওয়া। ওয়াকিবহাল মহলের মতে এই পরিকল্পনা পাকিস্তানের। যা কার্যত কাঠের পুতুলের মতো মেনে চলেছে মুহাম্মদ ইউনূস সরকার।
অপরদিকে ভারতের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উঠে আসছে একের পর এক জঙ্গি গোষ্ঠীর নাম। যারা গত বুধবার ধানমন্ডি কর্মসূচিতে প্রকাশ্যেই অংশগ্রহণ করেছিল। যেমন আল কায়দা, হিজবুর তাহরির, আনসার ইসলামের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলির হাত রয়েছে বাংলাদেশের এই অশান্তির ঘটনাগুলিতে। এই সব সংগঠনগুলি খাতায় কলমে নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমানে প্রকাশ্যেই তাঁদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তদারকি সরকার মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে মাত্র। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আগেই রিপোর্ট দিয়েছিল যে, বাংলাদেশে তদারকি সরকার গঠনের পর বহু শীর্ষ জঙ্গি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। বহু জঙ্গি জেল ভেঙে পালিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ক্রমশ মৌলবাদী ইসলামী কট্টরপন্থীদের হাতে চলে যাচ্ছে। ধানমন্ডির ঘটনা সেটারই প্রমান।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক বাংলাদেশকে কড়া জবাব দিল অবশেষে। এর আগে কূটনৈতিক ভাষায় কিছুটা জবাব দেওয়া হলেও খুব কড়া কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি। যা শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দিলেন। তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের উপদেষ্টারা যেভাবে দিনের পর দিন ভারত সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে চলেছেন, সেটা ভারত ভালোভাবে নিচ্ছে না। শুক্রবার বিকেল ৫টায় প্রথমে দিল্লির সাউথ ব্লকে তলব করা হয় বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশার নুরাল ইসলামকে। তাঁকে যেমন কড়া ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয় ভারতের মনোভাব। তেমনই সন্ধ্যায় সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, “দুই দেশের পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ভারত। কিন্তু এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক যে বাংলাদেশের কিছু আধিকারিক ভারতের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে চলেছেন। এবং সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের জন্য ভারতকে দায়ী করছেন, যেটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
এবার শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট করে দেয় ভারত। রণধীর জয়সওয়াল জানান, শেখ হাসিনা যে মন্তব্য করছেন সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বয়ান। ভারতের তাতে কোনও ভূমিকা নেই। ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক টেনে আনা দু’দেশের সম্পর্কে কোনও সাহায্য করবে না। ভারত যেমন দুই দেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে উদ্যোগী, তেমনই একই পদক্ষেপ বাংলাদেশও করবে বলে ভারত আশা করে।
অর্থাৎ, এটা স্পষ্ট যে ভারত শেখ হাসিনাকে খোলা ছাড় দিয়ে দিল। ফলে বাংলাদেশের দাবি মতো ভারত হাসিনার মুখ বন্ধ করবে না। উল্টে ভারত স্মরণ করিয়ে দিল যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এত কিছুর পরও ভারত যেমন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যক সাহায্য করে চলেছে, সেটা যেন মনে রাখে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বুঝিয়ে দেওয়া হল, ভারত এখনও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায়নি, কিন্তু উপদেষ্টারা মুখ বন্ধ না করলে কড়া ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না ভারত।












Discussion about this post