একটা কথা পরিস্কার, বাংলাদেশের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসলে গণ অভ্যুত্থানের ফসল। তাই এই সরকারের কাছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ মনে করেছিল মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েই বাংলাদেশের হাল বদলে ফেলবেন। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সোনার বাংলাদেশ গঠিত হবে। আসলে এই সমস্ত কথাই বোঝানো হয়েছিল সাধারণ মানুষকে। কিন্তু ছয়মাস পরও যে কে সেই অবস্থা। বলা ভালো আগের হাসিনা সরকারের আমল থেকেও খারাপ অবস্থা বাংলাদেশে। ফলে কয়েকটা রহস্যজনক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বাংলাদেশী আম নাগরিক। সেটা হল, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাবতীয় সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন, কার কথায় নিচ্ছেন? মুহাম্মদ ইউনূস কি পুরোপুরি ব্যার্থ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে, নাকি তিনিই কারও হাতের পুতুল?
মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ পেরিয়েছে ছয় মাস। তবুও অনেকে মনে করছেন, যে সমস্ত কাজগুলি অগ্রাধীকার ভিত্তিতে করার ছিল, সেগুলিতেই যেন মনোযোগ নেই ইউনূস প্রশাসনের। আবার বেশ কয়েকটি ঘটনায় মনে হচ্ছে, এই সরকারের যেন অস্তিত্বই নেই বাংলাদেশে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মাধ্যমে আসা একটা সরকারের যেমন কর্তৃত্ব থেকে তেমনই বড় কিছু দায়িত্বও থাকে। কিন্তু ইউনূস সরকারের কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের কোনও লক্ষণই সাদা চোখে ধরা পড়ছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ নেওয়ার পরবর্তী কয়েকমাস বাংলাদেশে যে ভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন বা সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর যেরকম তাণ্ডব চলেছে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করার কোনও প্রচেষ্টাই দেখায়নি ইউনূস প্রশাসন। আবার সাম্প্রতিক সময়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা, সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের ভাঙচুর, হামলা, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ব্যাপারে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা-সমন্বয়কদের বেদম মার খাওয়ার মতো ঘটনাতেও একই অবস্থা ফুটে উঠছে। সেনা. পুলিশ ও প্রশাসনের উপর কোনও নিয়ন্ত্রণই নেই মুহাম্মদ ইউনূস বা তাঁর উপদেষ্টাদের।
ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা হল রীতিমতো ঘোষণা করে। শুধু সেখানেই নয়, সারা দেশেই আওয়ামী লীগের নেতা, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন সেনাকর্তাদের বাড়িও ভাঙচুর হল। প্রায় ৭২ ঘণ্টা ধরে চলা এই তাণ্ডবে বুলডোজারসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র যেভাবে ব্যবহার করা হল, তাতে বোঝাই গেল যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এর সঙ্গে যুক্ত। অপরদিকে সেনাবাহিনীর যে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা রয়েছে, তাঁরাও সেটা প্রয়োগ করল না। পুরো বিষয়টিতে তিনটি ব্যাপার লক্ষ্য করা গিয়েছে, প্রথমটি অমনোযোগ, দ্বিতীয়টি আলস্য বা নিষ্ক্রিয়তা এবং অন্যদিকে অপার রহস্য। যারা ভাঙচুরের ডাক গিয়েছিল, তাঁরা তদারকি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংগঠন। তাই সরকার চোখ বুজে বসে ছিল। এই ধারণাই সামনে আসছিল। কিন্তু যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতা ও সমন্বয়করা মার খেল তখনই সরকার নড়েচড়ে বসলো। অপারেশন ডেভিল হান্ট বা শয়তানের খোঁজ শুরু করার নির্দেশিকা জারি হল। দেখা যাচ্ছে, যে বা যারা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলার ঘটনায় জড়িয়েছিল, তাঁদের ছাড় দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রেফতার করা হচ্ছে অপারেশন ডেভিল হান্টের নামে। এটাও খালি চোখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ।
আসল রহস্য এখানেই, সরকারের হয়ে সিদ্ধান্তগুলো কে নিচ্ছেন, কীভাবে নিচ্ছেন এবং কেন নিচ্ছেন?
শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের সরকারের প্রতি অভিযোগ ছিল, স্বৈরতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার। বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক রাজনীতি, জোর জবরদস্তি করা, মানুষকে ভয় দেখানো, আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং ভোট না করানোর মতো অভিযোগ ছিল। এই সমস্ত প্রচারের জেরেই কোটা বিরোধী আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থআনের রূপ নেয় বলে মনে করেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারের আমলেও সেই একই ঘটনা ঘটে চলেছে সকলের সামনে। অনেকেই দাবি করছেন, গণ–অভ্যুত্থানে ব্যক্ত বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা, বর্তমান সরকারের কার্যক্রমে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে যা যা হচ্ছে, তা পুরো গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। রাজনৈতিক মহলের অভিমত, বাংলাদেশে এখন যত এই ধরণের ঘটনা ঘটবে ততই লাভ ভারতের। বাংলাদেশে যত ধরনের নৈরাজ্য কিংবা সহিংসতা তৈরি হবে, সেগুলো আসলে বিজেপি সরকারের একটা বড় ধরনের হাতিয়ার হবে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার নামে যারা হিংসা ছড়াচ্ছে, ভাঙচুর, হামলা করছেন তাঁরা আদতে কি বিক্ষুব্ধ জনতা? আসল বিষয় হল, কিছু লোক বা কিছু গোষ্ঠী পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনগণকে প্ররোচিত করেছে। এই রাজনীতি কিংবা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা সৃষ্টির পেছনে দেশি–বিদেশি নানাজনের ভূমিকা থাকতে পারে। এটা চিহ্নিত করা, প্রতিহত করা এবং জনগণের সামনে স্পষ্ট করা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। এই জায়গাটাতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা দেখেই একটা উদ্বেগের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।












Discussion about this post